আগামী ৫ আগস্ট চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিজয় বার্ষিকী ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি নির্বাসনে থাকা দলীয় নেতাদেরও দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে এই ঘোষণা বাস্তব কোনো পরিকল্পনা নাকি আওয়ামী লীগকে পুনরায় সক্রিয় করার কৌশল, তা নিয়ে দলের ভেতরেই রয়েছে গভীর সংশয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রবল জনরোষের মুখে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার আগে দীর্ঘ ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা হিসেবে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে শত শত মামলা দায়ের হয়েছে। গত ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাকে এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফিরিয়ে আনতে ভারত সরকারকে চিঠি দিলেও এখন পর্যন্ত প্রত্যর্পণের বিষয়ে কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কাকতালীয় ব্যাপার হলো, স্বাধীনতার পর যে কয়টি গণঅভ্যুত্থান হয়েছে সবগুলোর ফলাফল হিসেবে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। ১৯৭৫ (১৯৭৫) সালের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় আসেন জিয়াউর রহমান। ১৯৯০ (১৯৯০) সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় আসেন খালেদা জিয়া। ২০২৪ (২০২৪) সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় এসেছেন তারেক রহমান। এর অর্থ হলো, জনগণ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ইতিবাচক রূপান্তরের দায়িত্ব বারবার বিএনপিকে দিয়েছে। তাই তারা শেখ হাসিনাকে বিনা বাধায় দেশে ঢুকতে দেবে না কোনোভাবেই।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার বিপরীতে বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ হত্যাকাণ্ডের জন্য তিনি এখনো প্রকাশ্যে কোনো দুঃখ প্রকাশ করেননি, বরং আন্দোলনকে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছেন। ভারতের পার্লামেন্টে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা নিজেই ফোন করে ভারতের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন, যা তার দীর্ঘদিনের ‘শেখ হাসিনা পালায় না’ দাবির অসারতা প্রমাণ করেছে। শেখ হাসিনাকে ঢাকায় ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় কার্যকর করার দাবি, হুমকি, মাতম সবই চলছে। কিন্তু তা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তা এখনো পরিষ্কার নয়। হাসিনা এখন ভারতে। সম্ভবত নয়াদিল্লিতে কঠোর পাহারা, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার মধ্যে আছেন। একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরেফিরে আসছে- তিনি কি নির্বাসনে? তাঁকে কি জোর করে দেশছাড়া করা হয়েছে? নাকি তিনি স্বেচ্ছায় গেছেন? এ নিয়ে একটা সন্দেহ আছে। কেননা, এর আগেও তিনি নির্বাসনে গেছেন। ১৯৭৫ (১৯৭৫) সালের আগস্ট হত্যাকাণ্ড ও একদলীয় বাকশাল সরকারের পতনের পর তিনি ভারতে চলে গিয়েছিলেন। সেখানে ছিলেন প্রায় ছয় বছর।
বিশ্লেষকদের মতে, গুম, খুন ও নিপীড়নের শিকার লক্ষ লক্ষ পরিবার এবং নতুন প্রজন্মের তীব্র ক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সুরক্ষা ছাড়াই তিনি যদি দেশে ফেরার চেষ্টা করেন, তবে ছাত্র-জনতা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত সরকারও তাদের দীর্ঘদিনের মিত্রকে রক্ষার জন্য বড় কোনো ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার যদি কোনো ধরনের পাঁয়তারা বা প্রচেষ্টা হয়, সরকার যদি সেটাকে প্রশ্রয় দেয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন সরকারই হবে। বাংলাদেশের আপামর জনগণ, জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী সব পক্ষ, ত্রিশ হাজার আহত ও ১ হাজার ৪০০ (১৪০০) শহীদ পরিবারের সদস্য, সবাই প্রস্তুত রয়েছে। সম্প্রতি স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার নিয়োগকৃত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করায় দেরিতে হলেও জাতির ঘাড় থেকে স্বৈরাচারের একটি কালো ছায়া সরে গেছে। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার ফিরে আসা কেবলই ফাঁসির রায় কার্যকর করার আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।





