দেশে গ্যাস সংকট চরম আকার ধারণ করেছে, যার ফলে গত এক সপ্তাহ ধরে শিল্প-কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসের স্বল্পচাপ ও অপর্যাপ্ত সরবরাহের কারণে অনেক কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক উদ্যোক্তা বাধ্য হয়ে কারখানা বন্ধ রাখছেন, আবার যারা উৎপাদনে আছেন তারাও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে পারছেন না। এতে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি রপ্তানি আয় বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে কারিগরি সমস্যার কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, বর্তমানে দুটি এফএসআরইউ দিয়ে এর চেয়ে বেশি এলএনজি আমদানি করা সম্ভব নয়, ফলে রাতারাতি জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা কম।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গাজীপুর, কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী, টঙ্গী, শ্রীপুর, মৌচাক, চন্দ্রা ও বোর্ডবাজার এলাকার শিল্পাঞ্চলগুলো। এসব এলাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। কোথাও কোথাও গ্যাসের চাপ শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসায় বয়লার, জেনারেটর ও যন্ত্রপাতি চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সাভার ও আশুলিয়ার প্রায় ১ হাজার ২০০ কারখানার অবস্থাও একই রকম। উদ্যোক্তাদের মতে, অনেক কারখানায় ১০ থেকে ১৫ পিএসআই চাপের প্রয়োজন হলেও পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১ থেকে ৩ পিএসআই।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, সরকার শিল্পখাতকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধানে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস এসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল ও বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ১৫ থেকে ২০ শতাংশে নেমে এসেছে, যা পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পের জন্য বড় হুমকি। এছাড়া স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ মাসাদুল আলম জানান, চাপের অভাবে অনেক স্টিল মিল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি মইনুল ইসলাম জানান, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, সময়মতো উৎপাদন শেষ করতে না পারলে ক্রয়াদেশ বাতিল, জরিমানা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সুনাম নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল এটিকে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মন্তব্য করেছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।





