নতুন অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের অর্থায়নের সঙ্কট একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ নেয়ার পরিমাণ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার পর ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্য কিছুটা কমানো হয়েছে। তবে আগের বছরের জমে থাকা বিশাল ঋণের সুদ পরিশোধের দায় এবং রাজস্ব আদায়ে সম্ভাব্য ঘাটতি নতুন বাজেট বাস্তবায়নে ঋণের চাপকে আরও জটিল করে তুলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন ২০২৬-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার নিট অভ্যন্তরীণ ঋণ নিয়েছে প্রায় এক লাখ ৩১ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। অথচ পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ছয় হাজার ৯০৪ কোটি টাকা বেশি ঋণ নেয়া হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১০৫ দশমিক ৫ শতাংশ। এর মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ নেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ ৩১ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা, যেখানে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণের মূল লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ শুধু ব্যাংক থেকেই নেয়া ঋণ পুরো অভ্যন্তরীণ ঋণের মূল লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি হয়েছে।
অন্যদিকে, ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে নিট ঋণ এসেছে মাত্র প্রায় ১৯২ কোটি টাকা, যেখানে আগের অর্থবছরে এই উৎস থেকে নিট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪২ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা। সরকারি অর্থায়নের কাঠামোতে ব্যাংকনির্ভরতা বাড়লেও ব্যাংকবহির্ভূত উৎস প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এটি আগের অর্থবছরের প্রকৃত ব্যাংকঋণের তুলনায় প্রায় ১৯ হাজার ৭০০ কোটি টাকা কম। তবে জুন ২০২৬ শেষে সরকারের মোট নিট অভ্যন্তরীণ ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা। এক বছর আগে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ লাখ ২১ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ঋণের স্থিতি বেড়েছে প্রায় এক লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা বা ১২ দশমিক ৯ শতাংশের বেশি। এই বিশাল ঋণই এখন নতুন বাজেটের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় তৈরি করছে।
নতুন অর্থবছরের সবচেয়ে বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো ঋণের সুদ পরিশোধ। বাজেট প্রস্তাবে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ব্যয়ের জন্য প্রায় এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর ফলে সরকারের রাজস্ব বাড়লেও তার একটি বড় অংশ উন্নয়নমূলক ব্যয় কিংবা নতুন বিনিয়োগে যাওয়ার আগে পুরনো ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে। এটি নতুন বাজেটের মৌলিক দ্বন্দ্বকে স্পষ্ট করে তুলেছে, যেখানে সরকার একদিকে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের কথা বলছে, অন্যদিকে অতীতের ঋণের দায় মেটাতে বাজেটের ক্রমবর্ধমান অংশ ব্যয় করতে হচ্ছে।
ব্যাংকঋণের এই বিপুল পরিমাণ সরকারি চাহিদা বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের জন্য অর্থের জোগান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ও তারল্য সঙ্কটের কারণে এমনিতেই ঋণ দেয়ার সক্ষমতা ও আগ্রহ সীমিত। সরকার বড় অঙ্কের ঋণ নিলে ব্যাংকগুলোর ব্যালান্সশিটে সরকারি সিকিউরিটিজের অংশ বেড়ে যায়। ফলে ব্যাংকগুলো ঝুঁকিপূর্ণ বেসরকারি খাতে ঋণ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন ও বিনিয়োগে যাওয়ার চেয়ে তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজে অর্থ বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে। অর্থনীতিতে এই অবস্থাকে বেসরকারি বিনিয়োগকে সরিয়ে দেয়ার ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়ানোর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।





