ষোলো বছর পর আবারও ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছে স্পেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনটি বিশ্বকাপ খেলেছে দলটি, কিন্তু নকআউট পর্বে জয় পেতে ব্যর্থ হয়েছে। একবার গ্রুপ পর্ব এবং দুবার শেষ ষোলো থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। অবশেষে লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে এসে দলটি ফর্মে ফিরেছে এবং ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছেছে।
১৯ জুলাইয়ের ফাইনালে মাঠে নামতে যাওয়া দে লা ফুয়েন্তের স্প্যানিশ দলের সঙ্গে ১৬ বছর আগের ভিসেন্তে দেল বস্কের দলের বেশ কিছু মিল পাওয়া যায়। উভয় দলই ইউরো শিরোপা জিতে বিশ্বকাপে এসেছিল এবং ফেবারিট হিসেবে শুরু করেও প্রথম ম্যাচে হোঁচট খেয়েছিল। ২০১০ সালের বিশ্বকাপ স্পেন শুরু করেছিল সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরে, আর ২০২৬ বিশ্বকাপের সূচনা হয়েছিল কেপ ভার্দের সঙ্গে ড্র করে।
গোলরক্ষকের ভূমিকায় ইকার ক্যাসিয়াস (২৯) এবং উনাই সিমন (২৯) দুজনেরই বয়স একই ছিল ফাইনালে। তবে ক্যাসিয়াস তখন স্পেনের অধিনায়ক এবং রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ী অভিজ্ঞ খেলোয়াড় ছিলেন। অন্যদিকে, উনাই সিমন কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও কোচ দে লা ফুয়েন্তের আস্থাভাজন হিসেবে টানা সুযোগ পেয়েছেন। এই বিশ্বকাপে সিমন মাত্র এক গোল হজম করেছেন এবং ছয় ম্যাচে ক্লিন শিট রেখেছেন। দুই বিশ্বকাপ মিলিয়ে টানা ৬০২ মিনিট অপরাজিত ছিলেন তিনি।
ফুলব্যাক পজিশনে ২০১০ সালে ছিলেন সার্জিও রামোস ও জোয়ান ক্যাপডেভিয়া। রামোসের বয়স ছিল ২৪ এবং ক্যাপডেভিয়ার ৩২। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের দলে পেদ্রো পোরো (২৬) ও মার্ক কুকুরেয়া (২৮) রয়েছেন। টটেনহ্যাম ও চেলসিতে হতাশাজনক মৌসুম কাটানোর পর পেদ্রো ও কুকুরেয়ার কাছ থেকে তেমন কিছু আশা করা হয়নি, বরং তাদের উইংব্যাক জুটিকেই দলের দুর্বলতা ভাবা হচ্ছিল। তবে বিশ্বকাপ শুরু হতেই তারা নিজেদের প্রমাণ করেছেন। বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগেই রিয়াল মাদ্রিদ কুকুরেয়াকে দলে ভেড়ায় এবং এরপর থেকে এই জুটি দারুণভাবে জ্বলে উঠেছে।
অন্যদিকে, ২০১০ সালের রামোস-ক্যাপডেভিয়া জুটি পুরো বিশ্বকাপ জুড়েই ফর্মে ছিলেন। রামোস ছিলেন সেই বিশ্বকাপের সেরা ড্রিবলার, মোট ৩১টি সফল ড্রিবল করেছিলেন। রক্ষণ এবং আক্রমণে সমানভাবে ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। ক্যাপডেভিয়াও নিজের কাজটা ঠিকঠাক করতেন, যার প্রতিফলন দেখা যায় তাদের ইউরো ও বিশ্বকাপ জয়ী ট্রফিতে।
সেন্টারব্যাক জুটিতে ২০১০ সালে ছিলেন কার্লোস পুয়োল (৩২) ও জেরার্ড পিকে (২৩)। ২০২৬ সালে এই ভূমিকায় আছেন এমেরিক লাপোর্ত (৩২) ও পাউ কুবারসি (১৯)। অনেকেই পুয়োল-পিকে জুটির ছায়া দেখছেন লাপোর্ত-কুবারসি জুটির মধ্যে। ২০১০ বিশ্বকাপে পুয়োল-পিকে জুটি মাত্র দুই গোল হজম করেছিল, আর এবার লাপোর্ত-কুবারসি জুটি হজম করেছে মাত্র এক গোল। বয়সের দিক থেকে লাপোর্ত ও পুয়োল সমানে সমান হলেও অভিজ্ঞতায় এগিয়ে ছিলেন পুয়োল। অন্যদিকে, পিকে কাগজে-কলমে এগিয়ে থাকলেও এমবাপ্পে-দেম্বেলে-ওলিসের মতো আক্রমণভাগকে রুখে দেওয়ায় কুবারসিকে ফাইনালের আগে এগিয়ে রাখা হচ্ছে।
ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে ২০১০ সালে ছিলেন সার্জিও বুসকেটস (২২) ও জাবি আলোনসো (২৮)। তাদের জুটি রক্ষণকে সামলানোর পাশাপাশি লম্বা পাসে খেলার চিত্রও বদলে দিতে পারত। তিকিতাকা কৌশলের জন্য প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ তারা নিচ থেকেই নিশ্চিত করতেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে এই দায়িত্ব পালন করছেন রদ্রি (৩০) (অধিনায়ক) ও ফাবিয়ান রুইজ (৩০)। বুসকেটস-আলোনসোর মতো অনন্য উচ্চতায় না পৌঁছালেও তারা নিজেদের কাজ নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করেছেন, যার ফলে স্প্যানিশ মাঝমাঠ কোনো সমস্যায় পড়েনি।
অ্যাটাকিং মিডফিল্ডে ২০১০ সালে ছিলেন জাভি (৩০) ও ইনিয়েস্তা (২৬)। এই জুটি স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। জাভির পাসে পুয়োল সেমিফাইনালে গোল করেছিলেন এবং ইনিয়েস্তার ফাইনালে করা গোল স্পেনের অধরা শিরোপা এনে দিয়েছিল। ২০২৬ সালের দলে এই ভূমিকায় আছেন দানি ওলমো (২৮) ও আলেক্স বায়েনা (২৫)। চলতি বিশ্বকাপে ওলমো-বায়েনা জুটি প্রতিটি ম্যাচেই পার্থক্য গড়ে দিচ্ছে। তবে তারা জাভি-ইনিয়েস্তার পর্যায়ে পৌঁছাতে পারবে কিনা, তা সময়ই বলবে।
আক্রমণভাগে ২০১০ সালে ছিলেন ডেভিড ভিয়া (২৮) ও পেদ্রো (২৩)। ২০২৬ সালে এই ভূমিকায় আছেন লামিনে ইয়ামাল (১৯) ও মিকেল ওয়ারসাবাল (২৯)। অভিজ্ঞতার সঙ্গে তারুণ্যের মিশেলে সাজানো হয়েছে আক্রমণভাগ। ভিয়া দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন এবং পেদ্রো তাকে সঙ্গ দিয়েছিলেন। এবার ইয়ামাল দলের নতুন মুখ হলেও ওয়ারসাবাল স্পেনের হয়ে প্রতি দুই ম্যাচে একটি গোল পেয়েছেন। ফাইনালেও এই জুটির কাছ থেকে বড় কিছু প্রত্যাশা করছেন সমর্থকরা।
কোচের ভূমিকায় ২০১০ সালে ছিলেন ভিসেন্তে দেল বস্ক (৫৯) এবং ২০২৬ সালে লুইস দে লা ফুয়েন্তে (৬৫)। বয়সে দেল বস্ক কিছুটা এগিয়ে থাকলেও অভিজ্ঞতায় তিনি অনেক এগিয়ে ছিলেন। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ী দেল বস্ক তার প্রথম বড় টুর্নামেন্টেই দলকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন ভিন্ন কৌশলে। অন্যদিকে, দে লা ফুয়েন্তে তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ হলেও স্প্যানিশ ফুটবল কাঠামোর সঙ্গে তার বেড়ে ওঠা। গত ১৩ বছর ধরে তিনি স্পেনের বিভিন্ন দলের সঙ্গে কাজ করছেন এবং এই দলকে নিয়ে ইউরো জিতেছেন ও ন্যাশনস লিগের ফাইনালে উঠেছেন।
কিন্তু এমবাপ্পে-দেম্বেলে-ওলিসে ত্রয়ীকে যেভাবে রুখে দিয়েছেন তারা, তাতে ফাইনালের আগে একটু এগিয়েই রাখতে হবে কুবারসিকে।ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডসার্জিও বুসকেটস ও জাবি আলোনসো বনাম রদ্রি (অধিনায়ক) ও ফাবিয়ান রুইজবয়স: ২২ ও ২৮ বনাম ৩০ ও ৩০২০১০ বিশ্বকাপ ছিল সার্জিও বুসকেটসের উত্থানের বিশ্বকাপ।





