২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কোনো জাদুকরী সমাধান নয়, এটি মূলত একটি নীতিগত রূপরেখা। এই বাজেটের সফলতা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে এর সঠিক বাস্তবায়নের ওপর। গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের জন্য এটি শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং একটি নতুন অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা। অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা, দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করা এবং কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধানই এই বাজেটের মূল উদ্দেশ্য। আজ বাংলাদেশের অর্থনীতি এক ধরনের ভঙ্গুর স্থিতিশীলতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আগামী বারো মাসই নির্ধারণ করবে দেশ টেকসই পুনরুদ্ধারের পথে এগোবে নাকি পুরনো দুর্বলতার চক্রে আটকে থাকবে।
দেশের অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতি রয়ে গেছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও নীতি সুদের হার বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে, তবে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এখনো কাটেনি। কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের প্রভাব পুরোপুরি দূর হয়নি। এমনকি সরকার শুল্ক কমালেও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর ও জেলা প্রশাসনের মতো সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে তার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মতো অনিশ্চয়তাগুলো মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপের কারণ হতে পারে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বর্তমানে মন্থর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৯৬ শতাংশ থেকে কমে দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৩.০৩ শতাংশে এবং তৃতীয় প্রান্তিকে ২.২২ শতাংশে নেমে এসেছে। শিল্প খাতের দুর্বল পারফরম্যান্স এবং উচ্চ সুদের হারের কারণে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না; এর পেছনে বড় কারণ উচ্চ সুদের হার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ঋণের সুদের হার বাজারভিত্তিক হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে তা ১২ থেকে ১৪ শতাংশ বা তারও বেশি। ফলে নতুন শিল্প স্থাপন বা ব্যবসা সম্প্রসারণের খরচ অনেক বেড়েছে।
রাজস্ব আহরণ বর্তমানে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম সর্বনিম্ন হওয়ায় বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ছে। সরকার যদি প্রত্যাশিত রাজস্ব সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়, তবে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ অথবা উন্নয়ন ব্যয় কমানোর মতো নেতিবাচক পথ বেছে নিতে হবে। অন্যদিকে, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এখনো অসম্পূর্ণ। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি আর্থিক ব্যবস্থায় বড় চাপ সৃষ্টি করছে। প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র আড়াল করার সংস্কৃতি ভাঙতে স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশনের সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন এবং পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো জরুরি।
বৈদেশিক খাতের অবস্থা কিছুটা ইতিবাচক হলেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। রেমিট্যান্স ও রফতানি বাড়লেও বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ ও এলডিসি থেকে উত্তরণের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। একই সাথে কর্মসংস্থান ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের অভাব দেশের জনমিতিক সুবিধাকে ভবিষ্যতের বড় বোঝায় পরিণত করতে পারে। সামগ্রিকভাবে, টেকসই পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে হলে কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন এবং বাজারের সিন্ডিকেট ভাঙার বিকল্প নেই। সংস্কারের গতি ধীর হলে অর্থনীতি নিম্ন প্রবৃদ্ধির ফাঁদ বা অতিরিক্ত ঋণের চক্রে আটকে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।




