মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার আবারো অস্থির হয়ে উঠেছে। গত দেড় মাসের ব্যবধানে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের জন্য বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে এক টাকা ৫৫ পয়সা। মে মাসে ব্যাংকগুলো যেখানে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৪৫ পয়সা দরে কিনেছিল, বর্তমানে সেই দাম বেড়ে প্রায় ১২৪ টাকায় পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৬০-৭০ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ১০০ ডলারে পৌঁছেছে। ফলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং সার আমদানিকারী সরকারি সংস্থাগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা অনেক বেড়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধান জানান, আগে জ্বালানি ও সার আমদানির জন্য সরকারের মাসিক ডলার প্রয়োজন হতো প্রায় ৩০ কোটি মার্কিন ডলার, যা এখন বেড়ে প্রায় ৪০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই অতিরিক্ত ১০ কোটি ডলারের চাহিদা বাজারে নতুন চাপ তৈরি করেছে।
ডলারের ওপর এই চাপের আরেকটি কারণ হলো রেমিট্যান্স প্রবাহে ধীরগতি এবং রফতানি আয়ের মন্থর প্রবৃদ্ধি। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত প্রতি মাসে তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এলেও জুনে তা ২ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে এবং জুলাইয়ে তা ২ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে সীমাবদ্ধ থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩৬ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার, যা দিয়ে পাঁচ মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। তবে বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জ্বালানি আমদানির পরিসংখ্যান পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৮৫ শতাংশ। এছাড়া গত আট বছরে এলএনজি আমদানিতে প্রায় দুই লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, আগে কম দামে খোলা আমদানি ঋণপত্রের (এলসি) বিপরীতে এখন বেশি দামে ডলার কিনে বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে, যার প্রভাব আন্তঃব্যাংক বাজারে পড়ছে। ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাসের শুরুতে প্রতি ডলার প্রায় ১২৩ টাকায় কেনাবেচা হলেও কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে তা বেড়ে ১২৩ টাকা ৯০ থেকে ৯৫ পয়সায় পৌঁছেছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট বিনিময় হার ঘোষণা করেনি, তবুও বাজারে নিবিড় তদারকি বজায় রাখা হয়েছে।
বেসরকারি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, বাজারে ডলারের প্রকৃত চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম। সুদের হার কমানোর পর টাকার বিনিময় হারের যে সমন্বয় প্রয়োজন ছিল তা না হওয়ায় চাপ আরও বেড়েছে। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া বিলাসী ও অপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিতে উচ্চ মার্জিন আরোপ করলে ডলারের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো।
ডলারের ওপর চাপ বাড়ার আরেকটি বড় কারণ রেমিট্যান্স-প্রবাহে গতি কমে যাওয়া। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত প্রতি মাসে তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এলেও জুনে তা কমে ২ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। জুলাইয়েও রেমিট্যান্স প্রায় একই পর্যায়ে, ২ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে সীমাবদ্ধ থাকে। একই সময়ে রফতানি আয়ও প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ কমলেও আমদানির চাপ অপরিবর্তিত থাকায় বাজারে ডলারের সঙ্কট আরো তীব্র হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩৬ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার, যা দিয়ে পাঁচ মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। তবে বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে রিজার্ভের ওপরও চাপ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।





