ঢাকেশ্বরী মন্দিরে ‘বেআইনি সমকামী বিয়ে’: বিচার চাইলেন ১২৩০ নাগরিক

প্রকাশ:

রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে একটি কথিত ‘বেআইনি সমকামী বিয়ে’র ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন দেশের ১ হাজার ২৩০ জন বিশিষ্ট নাগরিক। মঙ্গলবার ‘মূল্যবোধ আন্দোলন’ এর পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই দাবি জানানো হয়। দেশের শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিরা এই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন।

‘ঢাকেশ্বরী মন্দিরে বেআইনি সমকামী বিবাহে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করুন’ শিরোনামে প্রকাশিত এই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ঢাকেশ্বরী মন্দিরে সমলিঙ্গের বিয়ের ঘটনায় তারা বিস্মিত ও হতভম্ব। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, কামাল হোসেন নামে একজন জন্মগত সুস্থ পুরুষ, যিনি তাসনুভা আনান শিশির নাম নিয়ে নিজেকে ট্রান্সজেন্ডার বা রূপান্তরিত নারী হিসেবে দাবি করেন, তিনি দেশের প্রচলিত ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি ও আইন উপেক্ষা করে অন্য একজন হিন্দু পুরুষের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। মূল্যবোধ আন্দোলনের মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মাদ সাদাত প্রেরিত এই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পৃথিবীতে এমন কোনো চিকিৎসাপদ্ধতি নেই যা একজন পূর্ণাঙ্গ পুরুষকে পূর্ণাঙ্গ নারীতে রূপান্তর করতে পারে এবং একজন পুরুষ শুধুমাত্র ঘোষণা দিয়েই কোনো অপারেশন ছাড়াই পুরুষাঙ্গ নিয়ে নিজেকে ট্রান্সজেন্ডার নারী দাবি করতে পারে না।

বিবৃতিদাতারা যুক্তি দিয়েছেন যে, বাংলাদেশের সংবিধানে লিঙ্গ হিসেবে কেবল নারী ও পুরুষের উল্লেখ রয়েছে। ২০১৪ সালে লিঙ্গ-প্রতিবন্ধী হিজড়া জনগোষ্ঠীকে ‘হিজড়া লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে একটি গেজেট প্রকাশিত হলেও, বাংলাদেশের সংবিধান বা আইনে ‘ট্রান্সজেন্ডার’ বলে কোনো লিঙ্গের স্বীকৃতি নেই এবং ‘ট্রান্সজেন্ডার নারী’-কে নারী হিসেবে গণ্য করার কোনো আইনও বিদ্যমান নেই। এছাড়াও, দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুসারে সমকামিতা একটি নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য আচরণ হিসেবে পরিগণিত। সমকামিতা বা সমলিঙ্গের বিবাহের অভিযোগে আটকের বিভিন্ন দৃষ্টান্তও তুলে ধরা হয়েছে বিবৃতিতে।

বিবৃতিতে ট্রান্সজেন্ডারবাদকে ‘কুফরি মতবাদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা বিশ্বের বড় বড় ফতোয়া বিভাগের প্রসঙ্গ টানা হয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশও ‘ট্রান্সজেন্ডার উন্মাদনা’ (Transgender Insanity) দূরীকরণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং যে জেন্ডারবাদ থেকে ট্রান্সজেন্ডার ধারণার জন্ম, তাকে ‘চরমপন্থা’ (Extremism) ও নারী অধিকারের পরিপন্থী হিসেবে অভিযুক্ত করেছে বলে উল্লেখ করা হয়।

বিবৃতিদাতারা প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলেন, ইসলামী আইনে আঠারো বছরের নিচের বালেগ ছেলে-মেয়েদের বিবাহ নিষিদ্ধ না হলেও রাষ্ট্রীয় আইনের কারণে এ ধরনের বিবাহের উদ্যোগকে প্রশাসন স্বপ্রণোদিত হয়ে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। অথচ রাজধানীর বুকে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রশাসনের নাকের ডগায় আইনবিরোধী সমলিঙ্গের বিবাহ অনুষ্ঠানের সংবাদ প্রকাশের এক সপ্তাহের বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে গেলেও এ বিষয়ে প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি।

বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, ৯২ শতাংশ মুসলিম-অধ্যুষিত এই দেশের মানুষ শান্তিপ্রিয়, কিন্তু ধর্ম ও মূল্যবোধের প্রশ্নে অত্যন্ত সংবেদনশীল। যদি প্রকাশ্যে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে সমকামী বিবাহের এই অনাচারের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে তা শান্তিপ্রিয় জনগণকে ক্ষুব্ধ ও অসহিষ্ণু করে তুলতে পারে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। তাই, অনতিবিলম্বে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের এই ঘটনার তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে উপযুক্ত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জোর দাবি জানানো হয়েছে।

বিবৃতি প্রদানকারীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা মূল্যবোধ ডট কম (mullobodh.com) ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, বিবৃতিদাতাদের মধ্যে ৩৮ জন অধ্যাপক, ২৪ জন সহযোগী অধ্যাপক ও ৪৫ জন সহকারী অধ্যাপক রয়েছেন। উল্লেখযোগ্য স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন ড্যাফোডিল ইসলামিক সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক মোখতার আহমাদ, মসজিদ উত তাকওয়া সোসাইটি ধানমন্ডির খতিব মুফতি সাইফুল ইসলাম, মাসজিদুল জুমা কমপ্লেক্স পল্লবীর খতীব শায়খ আব্দুল হাই মুহাম্মাদ সাইফুল্লাহ, আইইউবির প্রফেসর ও মূল্যবোধ আন্দোলনের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির লেকচারার আসিফ মাহতাব উৎস, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল জাবের, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার, উত্তরার রূপায়ণ সিটি জামে মসজিদ খতীব মুফতি মুহাম্মাদ শামছুদ্দোহা আশরাফী, সাবেক সচিব নুরুল আলম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর জুলফিকার হাসান খান, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. সালমা বেগম, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. শামীমা তাসনিম, বুয়েটের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ তানভীর পারভেজ, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. সৈয়দ মো. গালিব, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. তারেক ফজল, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ মাকসুদ হোসেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মুহাম্মদ সাখাওয়াত হুসাইন ও আইইউবির প্রফেসর ড. মো. কাফিউল ইসলাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সামসুন নাহার মিতুল, জাগো নিউজের সহকারী বার্তা সম্পাদক মো. আনোয়ার হোসেন এবং সময় টিভির হেড অব ইসলাম মুফতি আবদুল্লাহ তামিম।

শেয়ার করুন