আগামী কয়েক সপ্তাহে ১৫ জেলায় ডেঙ্গু সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকি

প্রকাশ:

দেশের ৬৪ জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে এবং প্রতিদিন কয়েক শ মানুষ আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এই প্রতিরোধযোগ্য রোগে প্রায় প্রতিদিনই মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) গত চার বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সতর্ক করেছে যে, সেপ্টেম্বরের শেষ ও অক্টোবরের শুরুতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। বিশেষ করে আগামী সপ্তাহগুলোতে ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, পিরোজপুর, নারায়ণগঞ্জ, ঝালকাঠি, কক্সবাজার, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, বরিশাল, বরগুনা, বান্দরবান ও পটুয়াখালীতে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়বে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় আজ শনিবার থেকে সারা দেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে নামছে সরকার। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা থেকে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত জানিয়েছেন, এই কর্মসূচি তিন মাস ধরে চলবে এবং প্রতি শনিবার এই কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এছাড়া শিক্ষার্থীরাও তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান পরিষ্কার রাখবে। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, জনসম্পৃক্ততা ছাড়া ডেঙ্গু মোকাবিলা সম্ভব নয়। এই উদ্যোগে তিন-চারটি মন্ত্রণালয় জড়িত থাকবে এবং স্বেচ্ছাসেবক, বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নেবেন।

ঢাকায় তথা বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বড় ধরনের প্রকোপ প্রথম দেখা দেয় ২০০০ সালে। এরপর থেকে প্রতিবছর এডিস মশাবাহিত এই রোগে মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরের মানুষ আক্রান্ত হতেন। ২০১৯ সালে প্রথম সারা দেশে এই রোগ ছড়ায়। গত আড়াই দশকে মশা নিয়ন্ত্রণের বিজ্ঞানসম্মত উদ্যোগ না নেওয়ায় এবং মানুষকে কার্যকরভাবে সচেতন ও সম্পৃক্ত না করায় এই রোগ এখন স্থায়ী জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে দেশের সব জেলায় হামের সংক্রমণও চলছে, যেখানে এ বছর এক হাজারের বেশি শিশু মারা গেছে, যা পরিবারগুলোর উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৪৯ হাজার ২২০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ৫ জন, জুন মাসে ১৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন, আগস্টে ৪৩ জন এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম ১১ দিনে ৪৪ জন মারা গেছেন। এ নিয়ে এ বছর মোট ১৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে। সরকারি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসে আক্রান্তের সংখ্যা আগের মাসের চেয়ে বেড়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৬২ শতাংশ পুরুষ হলেও মৃত্যুর হার নারীদের মধ্যে বেশি (৫২ শতাংশ)।

আইইডিসিআর ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। ২০২৩ সালে দেশে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং ১ হাজার ৭০৫ জন মারা গিয়েছিলেন, যেখানে মৃত্যুহার ছিল শূন্য দশমিক ৫৩ শতাংশ। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে মৃত্যুহার ছিল যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৪৯ ও শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ। এ বছর ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মৃত্যুহার ছিল শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ, যা গতকাল পর্যন্ত সামান্য বেড়ে শূন্য দশমিক ২৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আইইডিসিআর এ বছর ৭১ জন রোগীর নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখেছে, ৯১ দশমিক ৫ শতাংশ সংক্রমণ ঘটছে ডেনভি৩-এর কারণে। বাকি ৮ দশমিক ৫ শতাংশ ডেনভি২-এর কারণে হচ্ছে, যা মূলত বরগুনা, বান্দরবান ও পিরোজপুরে সক্রিয়। ডেঙ্গুর চারটি ধরনই (ডেনভি১, ডেনভি২, ডেনভি৩ ও ডেনভি৪) বাংলাদেশে সক্রিয় রয়েছে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও কীটতত্ত্ববিদদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধযোগ্য হলেও সমন্বয়ের অভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ২০১৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ড. কে কৃষ্ণমূর্তিকে এবং ২০১৯ সালে বি এন নাগপালকে ঢাকায় পাঠিয়েছিল মশা নিয়ন্ত্রণে পরামর্শ দেওয়ার জন্য। বি এন নাগপাল জানিয়েছিলেন, সিটি করপোরেশনের কর্মীরা ঘরের ভেতরে ঢুকতে পারেন না, অথচ এডিস মশা আর্দ্রতা পছন্দ করে এবং টেবিল-চেয়ার বা সোফার নিচে বিশ্রাম নেয়। কিন্তু এসব পরামর্শ বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। আইইডিসিআর-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেন, সরকারের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই, তবে সঠিক পরিকল্পনা থাকতে হবে। রেড ক্রিসেন্টকে স্বেচ্ছাসেবক সম্পৃক্ত করার দায়িত্ব দিতে হবে এবং তিন মাস পর কর্মসূচির মূল্যায়ন করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত কয়েক বছর এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পাশাপাশি জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

শেয়ার করুন