সাইবার গ্যাং ও ডিপফেক প্রযুক্তিতে নারীদের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে

প্রকাশ:

এক সময়ের পাড়া-মহল্লার কিশোর গ্যাংগুলো এখন ফেসবুক গ্রুপ ও মেসেঞ্জার চ্যাটরুমের মাধ্যমে সংগঠিত হচ্ছে। বর্তমানে দেশে অন্তত ২৩৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে, যার মধ্যে ১২৭টিই রাজধানী ঢাকায়। এই গ্যাংগুলো অপরাধকে কনটেন্ট হিসেবে ব্যবহার করে মারধর, ছিনতাই বা অস্ত্র প্রদর্শনের ভিডিও টিকটক ও ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়ে আধিপত্য জাহির করছে। নারীদের টার্গেট করে কুৎসা রটানো বা ব্ল্যাকমেইল করার জন্য এরা সোক-পাপেট বা ভুয়া আইডি ব্যবহার করছে। সম্প্রতি নবম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীকে মারধরের ভিডিও টিকটক ও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়ার ঘটনাটি এই গ্যাং কালচারেরই অংশ, যেখানে অপরাধের মাধ্যমে নিজেদের পরিচিতি বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। পুলিশ অবশ্য ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর দ্রুত অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করেছে।

নারীদের নিরাপত্তার জন্য বর্তমানে ডিপফেক প্রযুক্তি বড় আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সাধারণ নারীর ছবি বা ভিডিওকে নিখুঁতভাবে পর্নোগ্রাফিক কনটেন্টের সাথে জুড়ে দেয়া হচ্ছে। জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, অনলাইনে থাকা ডিপফেক ভিডিওর ৯৮ শতাংশই পর্নোগ্রাফিক এবং এর লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তিদের ৯৯ শতাংশই নারী। ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নিতে এই প্রযুক্তিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা অনেক সময় ভুক্তভোগীকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী ইশরাতের (ছদ্মনাম) ব্যক্তিগত ছবি এআই ব্যবহার করে আপত্তিকর ভিডিওতে রূপান্তর করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গ্রুপে ছড়িয়ে দেয়া হয়। এর ফলে তিনি চরম মানসিক ট্রমা ও সামাজিক গ্লানির শিকার হন। পুলিশে অভিযোগ জানালেও ডিপফেক শনাক্ত করার কারিগরি দক্ষতার অভাবে অপরাধীকে ধরতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং ইউএনএফপিএর সাম্প্রতিক যৌথ গবেষণার তথ্যমতে, বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী নারীদের প্রায় ৮৯ শতাংশই অন্তত একবার অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের (পিসিএসডাব্লিউ) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ভুক্তভোগীদের মধ্যে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণীর হার প্রায় ৭৪ শতাংশ। অভিযোগের ৪১ শতাংশই ডক্সিং বা ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের ঘটনা। এছাড়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং ১৮ শতাংশ, ব্ল্যাকমেইলিং ১৭ শতাংশ, ভুয়া আইডেন্টিটি ৯ শতাংশ এবং সাইবার বুলিং ৮ শতাংশ হারে ঘটছে।

ফেসবুক, টিকটক বা ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম ভিউ বাড়ানোর জন্য তৈরি হওয়ায় বিতর্কিত কনটেন্ট দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। সাইবার গ্যাংগুলো এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নারীদের বিরুদ্ধে ট্রলিং ও চরিত্রহননের কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশে ১০ এপ্রিল থেকে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ কার্যকর হলেও এর প্রয়োগে নানা জটিলতা রয়েছে। প্রধান বাধা হলো ফেসবুক বা টিকটকের সার্ভার বাংলাদেশে না থাকা এবং অপরাধীদের ভিপিএন ও ডার্ক ওয়েবের ব্যবহার। লোকলজ্জার ভয়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ নারী কোনো অভিযোগই দায়ের করেন না।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আরিফ মঈনুদ্দীন বলেন, তথ্য সুরক্ষায় সমন্বিত ডেটা গভর্ন্যান্স, এনক্রিপশন ও অ্যাক্সেস কন্ট্রোলের অভাব আমাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তার এটিকে কেবল সাইবার অপরাধ নয়, এক ধরনের সামাজিক সহিংসতা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি ছোট বয়স থেকেই ডিজিটাল নৈতিকতা শেখানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ভুক্তভোগীদের উচিত আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত স্ক্রিনশট ও ইউআরএল সংরক্ষণ করা এবং পুলিশ সাইবার সাপোর্টে যোগাযোগ করা। এছাড়া ভুয়া অ্যাকাউন্ট রোধে এনআইডি যাচাই বাধ্যতামূলক করা এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিরাপদ করা সম্ভব।

শেয়ার করুন