২০ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২৪ ঘণ্টায় ৪৫ যৌন নিপীড়নের অভিজ্ঞতা: নতুন প্ল্যাটফর্মে চাঞ্চল্য

প্রকাশ:

শিশু বয়সে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার ঘটনাগুলো জনসমক্ষে তুলে ধরার লক্ষ্যে ‘আওয়াজ ডট বিডি’ (https://awaz.bd/) নামে একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম যাত্রা শুরু করেছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে চালুর পর মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ৪৫ জন ভুক্তভোগী তাদের শৈশবের ভয়াবহ নিপীড়নের অভিজ্ঞতার কথা এই সাইটে তুলে ধরেছেন। প্ল্যাটফর্মটি মূলত ছেলেশিশুদের ওপর হওয়া নির্যাতনের ঘটনাগুলো সামনে আনার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হলেও, এতে মেয়েরাও তাদের শৈশবের যৌন নির্যাতনের কথা লিখছেন।

প্ল্যাটফর্মটির উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৭ থেকে ১২ বছর বয়সের শিশুদের সংখ্যাই বেশি। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ৬৩ শতাংশ ভুক্তভোগী একাধিকবার নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, আর ৩৮ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। শুরুতে জোরপূর্বক এবং পরবর্তীতে ভয় দেখিয়ে এই নিপীড়ন চালানো হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভুক্তভোগীদের ৬৪ শতাংশই পুরুষ। ছেলেদের ক্ষেত্রে ৩২ শতাংশ পরিচিত, ২৬ শতাংশ বিশ্বস্ত পরিচিত, ১৬ শতাংশ নিকটাত্মীয় এবং ১০ শতাংশ দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের দ্বারা নিপীড়িত হয়েছেন। মেয়েদের ক্ষেত্রে ৭ শতাংশ পরিচিত, ১৪ শতাংশ বিশ্বস্ত পরিচিত, ১৪ শতাংশ নিকটাত্মীয় এবং ৪৩ শতাংশ দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের মাধ্যমে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া প্রতি পাঁচজনের একজন পরিবারের সদস্যদের দ্বারা নিপীড়িত হয়েছেন এবং ৫৬ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে বাড়িতে। এর মধ্যে ৫৪ শতাংশ নিজের বাড়িতে, ১৯ শতাংশ অভিযুক্তের বাড়িতে ও ১৫ শতাংশ নিজ আত্মীয়ের বাসায় ঘটেছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন নিপীড়নের চিত্রও উঠে এসেছে এই প্ল্যাটফর্মে। ৩৬ শতাংশ ভুক্তভোগী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন, যার মধ্যে ৫৬ শতাংশই কওমি মাদ্রাসার ঘটনা। এছাড়া ১৯ শতাংশ স্কুলে এবং মসজিদ, আলিয়া মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্লেখ রয়েছে। রাকিবুল হাসান (২৭) ও সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর (৪২) নামের দুই ব্যক্তি এই প্ল্যাটফর্মটি গড়ে তুলেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে পড়াশোনা করা রাকিবুল জানান, ছেলেশিশু ধর্ষণ ও বিশেষ করে মাদ্রাসায় শিশুধর্ষণের ঘটনাগুলো দেখেই তিনি এই উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি নিজেও কওমি মাদ্রাসায় পড়েছেন। তার মতে, এটি কোনো আইনি সহায়তা কেন্দ্র নয়, বরং সচেতনতা তৈরির একটি প্ল্যাটফর্ম। এর উদ্দেশ্য হলো সরকার ও মাদ্রাসা বোর্ডগুলোকে শিশুর প্রতি যৌন নিপীড়ন বন্ধে সক্রিয় হতে বাধ্য করা এবং সামাজিক চাপ তৈরি করা।

প্ল্যাটফর্মটিতে কোনো নাম, ছবি বা পরিচয় সংরক্ষণ করা হয় না এবং কোনো কুকি বা ট্র্যাকিং করা হয় না। ব্যবহারকারীদের দেওয়া বেনামি তথ্যের ভিত্তিতে এটি কাজ করে। ‘আওয়াজ উঠাও’ স্লোগানে চলা এই সাইটে স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে, ‘আপনার নীরবতা অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়, আপনার তথ্য অপরাধ দমনে সহায়তা করে’।

ভুক্তভোগীরা তাদের অভিজ্ঞতায় জানিয়েছেন, নিপীড়নের ঘটনাগুলো কেবল মাদ্রাসায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে আছে। অনেকে জানিয়েছেন, শৈশবে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর পরবর্তীতে তারা নিজেরাই নিপীড়ক হয়ে ওঠার মতো বীভৎস পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। এছাড়া, শিশুদের সুরক্ষায় মা-বাবাকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ‘শিশুরাই সব’ সংগঠনের আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার জানান, যৌন নির্যাতনের ঘটনা শিশুদের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। তিনি বিষয়টিকে জাতীয় সংকট হিসেবে বিবেচনা করে সরকারকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন।

শেয়ার করুন