আওয়ামী লীগের আদর্শিক বিচ্যুতি ও তৃণমূলের পুনর্জাগরণের প্রত্যাশা

প্রকাশ:

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্যতম মূলনীতি ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কেন্দ্রবিন্দু হলো গণতন্ত্র। দলটির গঠনতন্ত্রের ২(ঘ) বিধি অনুযায়ী, তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়, বিশেষত আশির দশক থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আওয়ামী লীগ অনন্য অবদান রেখেছে। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন দলটির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল। ২০০১ সালে সাংবিধানিক উপায়ে শান্তিপূর্ণভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য নজির।

তবে পরবর্তীতে সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। আওয়ামী লীগকে মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়, যেখানে দলটির দূরদর্শিতার অভাব ছিল কি না, তা পর্যালোচনার দাবি রাখে। পরবর্তীতে দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলো গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

এদেশের গণমানুষের দল হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগ ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তৃণমূলের মতামতকে সুকৌশলে অবজ্ঞা করেছে কি না, তা ভাববার অবকাশ রয়েছে। তৃণমূলের ভাবনাকে গুরুত্ব না দেওয়ার খেসারত আজ দলটিকে দিতে হচ্ছে কি না, তা পর্যালোচনার দাবি রাখে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আদর্শের প্রতি অবিচল না থাকলে রাজনৈতিক দল জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাই অতীত ভুল-ত্রুটি পর্যালোচনা করে গণতান্ত্রিক আদর্শে ফিরে যাওয়াই দলটির জন্য এখন অত্যাবশ্যক।

আগামী নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিতব্য ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ। জনগণকে পুনরায় কাছে টেনে নেওয়া এবং তাদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরাই দলের পুনর্জাগরণের পথপ্রদর্শক হতে পারেন। এর মাধ্যমেই আওয়ামী লীগ পুনরায় দেশের মানুষের কাছে আদর্শিক রাজনীতির চূড়ান্ত ভরসাস্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আওয়ামী লীগ 'আদর্শ বিবর্জিত' কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা জনবিচ্ছিন্ন কোনো 'গোষ্ঠী' নয়। আওয়ামী লীগ এদেশের গণমানুষের দল। এই দলে দীর্ঘ সময় ধরে (বিশেষত ২০১১-২০২৪ সময়ে) সকল জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তৃণমূলের মতামতকে 'সুকৌশলে' অবজ্ঞা করা হয়েছে কিনা, সেটা ভাববার অবকাশ আছে বৈকি! কিংবা কোনো পর্যায়ে কোনো ধরনের আলোচনা, যুক্তি, বিতর্ক, মতামত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তৃণমূলকে অবহেলা করার খেসারত আজ দলকে দিতে হচ্ছে কিনা? অথবা তৃণমূলের ভাবনাকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়াটা কি আওয়ামী লীগকে গণতান্ত্রিক আদর্শ হতে বিচ্যুত করেছিল কিনা, তা-ও পর্যালোচনার দাবি রাখে!

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন আগামী নভেম্বর মাসে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আওয়ামী লীগ এর জন্য উক্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ হবে জনগণকে আরো কাছে টানার, জনগণের সাথে মরচে ধরা সম্পর্ককে টেকসই রাজনৈতিক সম্পর্কে রূপান্তরিত করার এক সুবর্ণ সুযোগ। এক্ষেত্রে, পূর্বের সকল ঐতিহাসিক ক্রান্তিলগ্নের মতো, তৃণমূলের নেতা-কর্মীরাই হবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর পূণর্জাগরণের পথপ্রদর্শক- নতুন পথের দিশারী। এরই মাধ্যমে দেশের 'ঘরে-ঘরে' আওয়ামী লীগ পুনরায় আদর্শিক রাজনীতির চূড়ান্ত ভরসাস্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে।জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।১৫ ভাদ্র ১৪৩৩৩০ অগাস্ট ২০২৬

শেয়ার করুন