রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবস: বিচার ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবিতে উত্তাল ক্যাম্প

প্রকাশ:

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর ভয়াবহ নির্যাতন ও গণহত্যার শিকার হয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় নেওয়ার নয় বছর পূর্ণ হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের সেই ভয়াবহ দিনটিকে স্মরণ করে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পালিত হয়েছে ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবস’। ‘কালো দিবস’ আখ্যা দিয়ে রোহিঙ্গারা এই গণহত্যা ও নির্যাতনের বিচার, নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জোর দাবি জানিয়েছেন।

উখিয়ার লম্বাশিয়া আশ্রয়শিবির মাঠে রোহিঙ্গাদের সংগঠন ‘ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা (ইউসিআর)’ আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে প্রায় দেড় লাখ নারী-পুরুষ অংশ নেন। সমাবেশটি ছাড়াও ক্যাম্পের বিভিন্ন স্থানে পৃথক মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব আয়োজনে রোহিঙ্গা নেতারা সতর্ক করে বলেন, আলোচনার মাধ্যমে সম্মানজনক প্রত্যাবাসন সম্ভব না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। এক পর্যায়ে ইউসিআরের সদস্য আবু তাহের বলেন, আলোচনায় সমাধান না এলে তারা প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে নিতেও প্রস্তুত।

সমাবেশে ইউসিআরের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলমসহ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ছৈয়দ উল্লাহ এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। তারা রাখাইনে ফেরার জন্য কোনো আন্তর্জাতিক রোডম্যাপ না থাকলেও, নিজেরাই নিজেদের ফেরার পথ বা রোডম্যাপ তৈরি করছেন বলে জানান। সমাবেশে রোহিঙ্গা মৌলভী মো. ইউছুপ নিজ ভাষায় তারানা পরিবেশন করে নির্যাতনের চিত্র ফুটিয়ে তোলেন। এছাড়া টেকনাফের রোহিঙ্গা নেতা বদরুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলম এবং উখিয়ার মোহাম্মদ জোবায়েরসহ অনেকেই দ্রুত প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানান।

ক্যাম্পে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বক্তারা বলেন, তারা স্থায়ী শরণার্থী হয়ে থাকতে চান না। যারা রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে দাবি করেন, তাদের কাছে ঐতিহাসিক নথিপত্র ও প্রমাণের দাবি জানান আবু তাহের। এদিকে স্থানীয় সীমান্তবর্তী এলাকার নিরাপত্তা ও সামাজিক অস্থিরতা রোধে দ্রুত প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন নিরাপদ সীমান্ত আন্দোলনের প্রতিনিধি রুবায়েত হোসাইন। সমাবেশে গণহত্যার সময় নিহত স্বজনদের স্মরণে মোনাজাত করা হয়।

উল্লেখ্য যে, বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয়শিবিরগুলোতে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে ১৪ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একাধিকবার আলোচনা হলেও বাস্তবে বড় পরিসরে কোনো রোহিঙ্গা নিজ দেশে ফিরতে পারেননি। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রোহিঙ্গাদের অনাস্থা ও মিয়ানমারের পরিস্থিতিতে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ইউএনএইচসিআরের তথ্যমতে, ৩০ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ১২ লাখ ১৭১ জন। এর মধ্যে কক্সবাজারে ১১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৫২ জন এবং নোয়াখালীর ভাসানচরে ৩৩ হাজার ৮১৯ জন অবস্থান করছিলেন। নিরাপত্তা নিশ্চিতে এপিবিএন ক্যাম্পগুলোতে কঠোর নজরদারি বজায় রেখেছে এবং গণহত্যা দিবসের কর্মসূচিগুলো শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন ১৬-এপিবিএনের অতিরিক্ত ডিআইজি মুহাম্মদ কাউছার সিকদার।

শেয়ার করুন