সাভারের এমপি, তাঁর স্ত্রী ও ভাই—তিনজনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি

প্রকাশ:

ঢাকার সাভারের একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গাজিরচট আকবর মন্ডল উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের অ্যাডহক বা অস্থায়ী পরিচালনা কমিটির সভাপতি করা হয়েছে ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিনকে। গত ৯ জুলাই তিনি এই দায়িত্ব পেয়েছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. মোজাফফর হোসাইন জানিয়েছেন, ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড এই কমিটি অনুমোদন দিয়েছে। সভাপতি হিসেবে সংসদ সদস্যের নামসহ তিনজনের নাম ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল, সেখান থেকে অনুমোদন পাওয়ার পর শিক্ষা বোর্ড তা চূড়ান্ত করে।

তবে সংসদ সদস্যকে সভাপতি করা নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠেছে। ২০০৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের প্রবিধানমালায় সংসদ সদস্যদের সভাপতি হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সীমা ছিল না। কিন্তু ২০০৯ সালের প্রবিধানমালা অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্য তাঁর নির্বাচনী এলাকার সর্বোচ্চ চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সভাপতি হতে পারতেন। পরবর্তীতে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় ২০১৬ সালে উচ্চ আদালত ওই প্রবিধানমালার কিছু অংশ অবৈধ ঘোষণা করেন। এর ফলে সংসদ সদস্যরা নিজ নির্বাচনী এলাকায় চাইলেও সভাপতি হতে পারেন না। এছাড়া ২০২০ সালে উচ্চ আদালতের আরেকটি রায়ে বলা হয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর পরিচালনা কমিটির সভাপতি হতে পারবেন না সংসদ সদস্যরা।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের বেসরকারি সব স্কুল ও কলেজের পরিচালনা কমিটি ভেঙে দিয়েছিল। তখন উপজেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। গত মার্চে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অ্যাডহক কমিটি গঠনসংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করে। এতে বলা হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান তিনজন সম্ভাব্য ব্যক্তির নাম ও জীবনবৃত্তান্ত শিক্ষা বোর্ডে পাঠাবেন। প্রস্তাবিত ব্যক্তিরা সরকারি, আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির কর্মচারী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ, স্থানীয় শিক্ষানুরাগী, খ্যাতিমান ব্যক্তি, সমাজসেবক অথবা প্রতিষ্ঠাতা হতে পারবেন। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের উচ্চপর্যায়ের দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আদালতের রায় ও মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের মূল চেতনা অনুযায়ী অ্যাডহক কমিটিতেও সংসদ সদস্যদের সভাপতি হওয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে সংসদ সদস্য দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ সভাপতি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিয়মনীতির ব্যত্যয় হলে বোর্ড তা জানাতো।

সংসদ সদস্যের পরিবারের অন্য সদস্যরাও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সভাপতি পদে রয়েছেন। গত জুন মাসে দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের ছোট ভাই দেওয়ান মোহাম্মদ মঈনউদ্দিনকে সাভারের শিমুলিয়া শ্যামা প্রসাদ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ওই কলেজের প্রধান শিক্ষক মো. ইয়ার হোসেন। এছাড়া গত জুলাই মাসে সংসদ সদস্যের স্ত্রী সাবিনা সিদ্দিকাকে সাভারের মোফাজ্জল-মোমেনা চাকলাদার মহিলা কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি করা হয়েছে। কলেজটির গভর্নিং বডির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৭ সালের এপ্রিলে, কিন্তু তার আট মাস আগেই সভাপতিকে বাদ দিয়ে সংসদ সদস্যের স্ত্রীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত আগের সভাপতি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য শিহাব উদ্দিন খানের মেয়াদ ছিল। গত ২৩ জুলাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শক নাজিম উদ্দিন আহমেদের সই করা চিঠিতে শিহাব উদ্দিন খানের পরিবর্তে সাবিনা সিদ্দিকাকে সভাপতি হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। শিহাব উদ্দিন খান অভিযোগ করেন, নিয়ম অনুযায়ী কলেজ থেকে নামের প্যানেল পাঠানোর কথা থাকলেও তা মানা হয়নি। তিনি মনে করেন, সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপ ও স্বজনপ্রীতিতে এমনটি হয়েছে। তবে সংসদ সদস্য দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন হস্তক্ষেপ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষকদের আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে যথাযথ প্রক্রিয়ায় সাবিনা সিদ্দিকাকে সভাপতি করা হয়েছে। নতুন সভাপতি সাবিনা সিদ্দিকা দাবি করেন, শিক্ষকরা তাঁকে সভাপতি করার ক্ষেত্রে আগ্রহী ছিলেন এবং তাঁর যোগ্যতা বিবেচনায় নিয়ে এই নিয়োগ হয়েছে। যদিও কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এস এম এ জামান জানিয়েছেন, সভাপতি পরিবর্তনের জন্য তাঁদের পক্ষ থেকে কোনো প্রস্তাব পাঠানো হয়নি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ই-মেইলের মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হয়েছে।

শেয়ার করুন