‘জিনের বাদশা’ পরিচয়ে এক গৃহবধূর কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ২৩ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সৌদিপ্রবাসী স্বামীর পাওনা ৩৫ লাখ টাকা উদ্ধারের প্রলোভন দেখিয়ে চক্রটি এই প্রতারণা করে। গত ১৩ জুলাই এই অভিযোগপত্র দাখিল করা হয় এবং ১৬ জুলাই এটি নথিভুক্ত হয়েছে। আগামী রোববার অভিযোগপত্রটি আমলে নেওয়ার বিষয়ে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
ভুক্তভোগী গৃহবধূ রহিমা বেগম ২০২২ সালের ৮ মার্চ ফেসবুকে 'হাবিবুল্লাহ হুজুরের দরবার শরীফ', 'জৈনপুরী মা-ফাতেমা দরবার শরীফ' ও 'তান্ত্রিককম.ঘর' নামের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রতারক চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এসব বিজ্ঞাপনে পাওনা টাকা উদ্ধার, স্বামী-স্ত্রীর মিল, ভাগ্য পরিবর্তন ও লটারিতে জেতানোর মতো নানা আশ্বাস দেওয়া হতো। রহিমা বেগমের স্বামী কবির হোসেন সৌদি আরবে ১৭ জন শ্রমিককে পাঠানোর জন্য নিজের কফিলকে ৩৫ লাখ টাকা দিয়েছিলেন, কিন্তু ভিসা জটিলতায় শ্রমিকরা যেতে না পারলেও কফিল টাকা ফেরত দেননি। এই টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করছিলেন রহিমা।
তদন্তে জানা গেছে, প্রতারকেরা নিজেদের জিনের বাদশা ও আধ্যাত্মিক সাধক পরিচয় দিয়ে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে টাকা উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিত। এরপর আগরবাতি, মোমবাতি, গোলাপজল ও সিঁদুর কেনার কথা বলে প্রথমে টাকা নেওয়া হয়। পরে ‘বদ জিনের শনি কাটাতে’ ভুটানি গরুর ২১ কেজি দুধ দিয়ে জিন-পরিকে পবিত্র করা, জিনের মাধ্যমে ‘রত্নময়ী শ্রী আংটি’ পাঠানো এবং জিনদের জন্য মিষ্টি, আগুনে ছোঁয়া বিশেষ শাড়ি, বিদেশি জাতের শকুন ও আবাবিল পাখি আনার কথা বলে ধাপে ধাপে মোট ১০ লাখ ২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। টাকা নেওয়ার পর প্রতারকেরা যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।
এ ঘটনায় গত ২২ এপ্রিল, ২০২৪ তারিখে রহিমা বেগম রাজধানীর তেজগাঁও থানায় একটি মামলা করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সজিবুল হাসান জানান, এই চক্রটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অলৌকিক ক্ষমতার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করে আসছিল এবং মানুষের বিশ্বাস অর্জনে ধর্মকেও ব্যবহার করত।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ঘটনার পর গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও ভোলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মো. রাকিব (২০), মো. রাকিব মোল্লা (২৯) ও মো. আলাউদ্দিন (২৬)। তাঁদের কাছ থেকে চারটি মুঠোফোন, প্রতারণায় ব্যবহৃত তিনটি ভিডিও, ভুক্তভোগীদের ভয় দেখানোর ১০টি ভয়েস রেকর্ড এবং সাতটি বিজ্ঞাপনের ছবি জব্দ করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত এই তিন আসামি বর্তমানে জামিনে আছেন।
অভিযোগপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতারকেরা অনলাইন থেকে সম্পাদনা করা বিকৃত ও ভীতিকর ছবি জিন-পরির ছবি বলে ভুক্তভোগীদের পাঠাত। নিজেদের কণ্ঠ বিকৃত করে রেকর্ড করা বক্তব্য জিনের বাদশার কথা বলে ভয় দেখাত। কাউকে বিষয়টি জানালে সন্তানের মৃত্যু হবে বা পরিবারে অমঙ্গল নেমে আসবে—এমন ভয় দেখিয়ে তাদের চুপ থাকতে বাধ্য করত। ভুক্তভোগী রহিমা বেগম জানান, প্রতারকেরা কোরআনের ওপর হাত রেখে শপথ করাত এবং বলত, কাউকে এ ঘটনা জানালে জিনরা ক্ষতি করবে, ছেলেমেয়ের গলা দিয়ে রক্ত উঠে মারা যাবে।
গ্রেপ্তারকৃত তিন আসামি আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে প্রতারণার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। আসামি মো. রাকিব তাঁর জবানবন্দিতে জানান, ২০২০ সাল থেকে তিনি ‘জিনের বাদশা’ সেজে প্রতারণা শুরু করেন। তিনি স্বীকার করেন যে, সৌদি কফিলের কাছ থেকে টাকা উদ্ধার করে দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন কৌশলে মামলার বাদীর কাছ থেকে প্রায় ৮ লাখ টাকা নিয়েছেন। তিনি আরও জানান, প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপনে সব সমস্যার সমাধান, পাওনা টাকা আদায়, স্বামী-স্ত্রীর মিল করে দেওয়া, মামলা-মোকদ্দমায় জয়ী করা, গুপ্তধন পাইয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে ভিসা পাইয়ে দেওয়ার মতো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো। কেউ ফোন করলে আগরবাতি, মোমবাতি, গোলাপজল ইত্যাদি কেনার জন্য হাদিয়া হিসেবে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা চাইতেন এবং পরে খাসি, গরু, ভুটানি গরুর দুধ কেনার জন্য ধাপে ধাপে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাইতেন। রাকিব এ পর্যন্ত ২-৩ কোটি টাকা প্রতারণা করে হাতিয়ে নিয়েছেন এবং এই টাকা তাঁর ও তাঁর গ্রুপের লোকজনের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া হতো। তিনি নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে সিম ব্যবহার করতেন।
আরেক আসামি মো. রাকিব মোল্লা জবানবন্দিতে জানান, তিনি ২০১৯ সাল থেকে জিনের বাদশা সেজে প্রতারণা করে আসছেন। তিনি টেলিভিশন, ফেসবুক ও ইউটিউবে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য প্রতি পাঁচ দিনে ১৫ হাজার টাকা খরচ করতেন এবং এসব কাজে অন্যের সিম ব্যবহার করতেন।
পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা ২৩ জনকে আসামি করেছেন, যাদের অধিকাংশের বাড়ি ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায়। গ্রেপ্তারকৃত তিনজন ছাড়া অন্য ২০ জনকে পলাতক উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হয়েছে। এছাড়া, ভুয়া সিম সরবরাহকারী ‘ইমন’ নামের এক ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় তাকে আপাতত অব্যাহতি দিয়ে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিলের আবেদন করা হয়েছে। পিবিআই জানিয়েছে, এই মামলার কয়েকজন আসামির বিরুদ্ধে চুরি, ডাকাতি ও মাদক-সংক্রান্ত একাধিক মামলা রয়েছে।
প্রতারণার শিকার রহিমা বেগম মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং একপর্যায়ে টাকার চিন্তায় গলায় উড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যারও চেষ্টা করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সজিবুল হাসান জানান, এই চক্রে ২০ জনের বেশি প্রতারক কাজ করে এবং তারা মানুষের বিপদ-আপদ ও দুর্বল দিকগুলো নিয়ে কথা বলে প্রতারণা করত। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা আছে।
আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল ইসলাম বলেন, আসামিরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করছেন। আরেক আইনজীবী সুজন তালুকদার জানান, তিনি আসামি আলাউদ্দিনের পক্ষে কাজ করেছিলেন এবং হাইকোর্ট থেকে তাঁর জামিন হয়। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয় এবং দোষী ব্যক্তিরা যথাযথ শাস্তি পাবে বলে তিনি আশা করেন।





