সরকারের উচ্চপর্যায়ের ইচ্ছায় আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পরিচালনার ভার আবারও পুরোনো উদ্যোক্তাদের হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে অনিয়ম ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও নতুন পর্ষদে স্থান পেয়েছেন। পরিচালক নিয়োগের মাত্র দুই দিনের মাথায় বাধ্য হয়ে দুজনকে পর্ষদ থেকে বাদ দিতে হয়েছে। নতুন করে পর্ষদ পুনর্গঠনের মাধ্যমে ব্যাংকটির মূল নিয়ন্ত্রণ চলে এসেছে চট্টগ্রামভিত্তিক কেডিএস গ্রুপের হাতে। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে কেডিএস গ্রুপ আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের পাশাপাশি ন্যাশনাল ব্যাংকের দায়িত্বেও ছিল। এই দুই ব্যাংকেই তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিল বিতর্কিত এস আলম গ্রুপ।
২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ব্যাংকটির পর্ষদ ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। গঠন করা হয় স্বতন্ত্র পরিচালনা পর্ষদ। তাতে ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান লংকাবাংলা ফিন্যান্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক খাজা শাহরিয়ার। এ ছাড়া পর্ষদের অন্য স্বতন্ত্র পরিচালকদের মধ্যে ছিলেন মো. শাহীন উল ইসলাম, মো. আবদুল ওয়াদুদ, এম আবু ইউসুফ ও মোহাম্মদ আশরাফুল হাসান। পর্ষদ পুনর্গঠনের আগপর্যন্ত স্বতন্ত্র পরিচালকেরা ব্যাংকটি পরিচালনা করে আসছিলেন। স্বতন্ত্র পরিচালকদের সময়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে ব্যাংকটিতে নিরীক্ষা করা হয়। এতে বিভিন্ন অনিয়ম উঠে আসে।
গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর দুটি পক্ষ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নিতে তৎপর হয়ে ওঠে। এরপর কেডিএস গ্রুপ ব্যাংকটির মালিকানা ফেরত চায়। অন্যদিকে আরেকটি পক্ষ তাদের শেয়ারের বিপরীতে পরিচালক পদ দাবি করে। এই পক্ষে ছিলেন সাবেক পরিচালক ও বর্তমান ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন (কায়কোবাদ)। সরকারের একটি পর্যায় থেকে দুই পক্ষ থেকে ২ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা যাদের হাতে ছিল, তাদের হাতে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি আগের পাঁচ স্বতন্ত্র পরিচালককেও বহাল রাখা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক শেয়ারধারীদের মধ্য থেকে যে ১৪ জনকে পর্ষদে নিয়োগ দেয়, তাঁদের মধ্যে ৬ জনই কেডিএস গ্রুপ ও গ্রুপটির শীর্ষ নেতৃত্বের আত্মীয়স্বজন। তাঁরা হলেন কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান, তাঁর ছেলে সেলিম রহমান, খলিলুর রহমানের ভাই আহমেদুল হক, কেডিএস গার্মেন্টসের প্রতিনিধি পরিচালক মাহবুব আহমেদ, কেডিএস টেক্সটাইলের প্রতিনিধি পরিচালক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও কেওয়াই স্টিল মিলসের প্রতিনিধি মোহাম্মদ শরিফ উদ্দিন তসলিম। এ ছাড়া কেডিএস মালিকদের আত্মীয়রাও নিয়োগ পেয়েছেন। পর্ষদে নিয়োগ পাওয়া অন্য পরিচালকদের মধ্যে ব্যাংকটির নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান বদিউর রহমানও কেডিএস পরিবার–সংশ্লিষ্ট। অন্য পরিচালকদের মধ্যে রয়েছেন সর্বশেষ নির্বাচনে ঢাকা-৭ থেকে জামায়াতের হয়ে নির্বাচন করা মো. এনায়াত উল্লা, রফিকুল ইসলাম, ইমাদুর রহমান, নাজমুল আহসান খালেদ, আনোয়ার হোসাইন, আবদুস সালাম ও লিয়াকত আলী চৌধুরী।
কেডিএস গ্রুপ থেকে পাঁচ পরিচালক নিয়োগ দেওয়া নিয়ে বিতর্ক ওঠায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও মোহাম্মদ শরিফ উদ্দিন তসলিম পদ গ্রহণ করেননি। কারণ, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, এক পরিবার বা গ্রুপ থেকে তিনজনের বেশি পরিচালক থাকার সুযোগ নেই। তাই কেডিএসের দুজন প্রতিনিধি বাদ যাওয়ার পর ব্যাংকটিতে নতুন করে খন্দকার মেজবাহ উদ্দিন আহমেদকে পরিচালক নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১৫ জুলাই আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন হয়। এর পরদিনই ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান, আর নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন কেডিএসের সেলিম রহমান।
এদিকে পর্ষদ পুনর্গঠনের পরপরই নিযুক্ত পরিচালকদের কয়েকজন নানা অনিয়মে আগে চাকরিচ্যুত ও অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের ব্যাংকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন। এমনকি নবগঠিত পর্ষদের প্রথম সভাতেও এসব বিতর্কিত কর্মকর্তার কয়েকজনকে দেখা গেছে। একই সঙ্গে নতুন পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকটির একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে (ডিএমডি) পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে।
আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের সাবেক দুই চেয়ারম্যানের ব্যবহারের জন্য অনিয়ম ও নিয়মবহির্ভূতভাবে সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার বিলাসবহুল মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি কেনার তথ্য উঠে আসে আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান কেপিএমজি এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে। ২০২২ সালের ১৫ জুন ব্যাংকের ৩৭৪তম পরিচালনা পর্ষদ সভায় তৎকালীন চেয়ারম্যান সেলিম রহমানের জন্য এক কোটি টাকা সীমার মধ্যে একটি গাড়ি কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু পর্ষদের অনুমোদন তোয়াক্কা না করে ২ কোটি ২৩ লাখ টাকা ব্যয়ে মার্সিডিজ বেঞ্জের একটি গাড়ি কেনা হয়। একইভাবে ২০২৩ সালের আগস্টে কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই অপর সাবেক চেয়ারম্যান আবদুস সামাদের জন্য ৩ কোটি ২৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকায় একই মডেলের আরেকটি মার্সিডিজ কেনা হয়। গাড়ি দুটি ব্যাংকের নিজস্ব নামে নিবন্ধন না করে দুটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানের নামে কেনা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তির কারণে গাড়ি দুটি ইতিমধ্যে ব্যাংকের হেফাজতে আনা হয়েছে।
১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের আমানত গত বছরের ডিসেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ৫৪ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। তখন ব্যাংকটির ঋণ বা বিনিয়োগ ছিল ৫০ হাজার ১২১ কোটি টাকা। ব্যাংকটির ঋণের ১৭ দশমিক ৬১ শতাংশ খেলাপি। গত বছর ব্যাংকটি নিট মুনাফা করেছে ৮৫ কোটি টাকা। উচ্চ খেলাপির কারণে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে শেয়ারধারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি ব্যাংকটি। এতে ব্যাংকটি শেয়ারবাজারে জেড ক্যাটাগরিতে চলে গেছে। সারা দেশে ব্যাংকটির রয়েছে ২২৬টি শাখা। ব্যাংকটিতে কর্মরত রয়েছেন ৫ হাজার ৫৯৩ জন কর্মী।
এ বিষয়ে নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান বদিউর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন পর ব্যাংকে ফিরে এসেছি। এখন আমার মূল দায়িত্ব ব্যাংকটিকে পেশাদারির সঙ্গে পরিচালিত করা, যাতে নতুন করে কোনো অনিয়ম না হয়। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে যাঁদের চাকরি গেছে, তাঁদের ফিরিয়ে আনার সুযোগ নেই। নতুন করে অনিয়ম হলে ব্যাংকটি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। চেয়ারম্যান হিসেবে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করাই আমার প্রধান কাজ। আমি দুই পক্ষের সম্মতিতে ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছি। ডিএমডি নিজের ইচ্ছাতেই পদত্যাগ করেছেন। আমরা কোনো নির্দেশনা দিইনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, ব্যাংকগুলো শেয়ারধারী পরিচালকেরা পরিচালনা করবেন, এটা স্বাভাবিক। তবে তারা এত দিন কী করেছে, তা জাতি দেখেছে। নতুন করে এমন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া ঠিক হবে না, যাঁরা ব্যাংকের জন্য ন্যূনতম ঝুঁকি তৈরি করতে পারেন। অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করে পরিচালক নিয়োগ দেওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংক আবার কারও প্রভাবে ব্যবহৃত হলে সেটা হবে জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক।





