একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এখন কয়েক মিলিমিটারের সিলিকন চিপ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ৬জি টেলিযোগাযোগ, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান, ডেটা সেন্টার, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং আধুনিক স্যাটেলাইটের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তির মূল চালিকাশক্তি এই সেমিকন্ডাক্টর। এই প্রেক্ষাপটে, ২০২৬ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম ও বিয়ার সামিট ২০২৬ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, বিশেষত যখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তীব্র চিপ যুদ্ধ চলছে এবং তাইওয়ান এই সংঘাতের কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
ঢাকার এই সম্মেলন নিয়ে বেইজিং আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিবাদ না জানালেও, অভ্যন্তরীণভাবে এটিকে তাদের ‘রেড লাইন’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় হিসেবে দেখছে, যা তারা পূর্ববর্তী বিএনপি সরকারের সময় তাইওয়ানের ট্রেড সেন্টার খোলার বিষয়েও দেখিয়েছিল। সম্মেলনে তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি (টিএসএমসি) বা তাইওয়ান সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন কিনা, তা নথিভুক্ত না থাকলেও, বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যে নীরব চিপ কূটনীতি শুরু হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বাংলাদেশের প্রাথমিক কৌশল হলো আন্তর্জাতিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত হওয়া। বাংলাদেশ এখনই উন্নতমানের সিলিকন ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশন বা চিপ উৎপাদনের মতো ব্যয়বহুল দৌড়ে নামছে না, বরং প্রযুক্তি শৃঙ্খলের কম মূলধনী কিন্তু কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশ যেমন—আইসি ডিজাইন, চিপ যাচাইকরণ ও পরীা, ইডিএ (ইলেক্ট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন), এমবেডেড সিস্টেম ও সফটওয়্যার এবং উন্নত প্যাকেজিং পরিষেবাগুলোতে মনোযোগ দিচ্ছে। একটি আধুনিক চিপ কারখানা স্থাপনে ১০ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পাশাপাশি অতি বিশুদ্ধ পানি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং জটিল কেমিক্যাল সরবরাহব্যবস্থা প্রয়োজন, যা বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় চিপ ডিজাইনে মনোনিবেশ করাকে একটি বাস্তবসম্মত কৌশল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
বিশ্ব-অর্থনীতি বর্তমানে ‘চীন প্লাস ওয়ান’ কৌশলের ওপর ভর করে চলছে। কোভিড-১৯ মহামারী এবং ওয়াশিংটন-বেইজিং বাণিজ্যযুদ্ধ একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর বৈশ্বিক উৎপাদন বা প্রযুক্তির অতি-নির্ভরতার ঝুঁকি স্পষ্ট করেছে। ফলে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সাপ্লাই চেইন একাধিক দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পেছনে রয়েছে তরুণ ও দ্রুত প্রসারমান প্রকৌশলী গোষ্ঠী (১), ভিয়েতনাম বা ভারতের তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক মজুরি (২), দ্রুত সম্প্রসারিত ডিজিটাল অবকাঠামো (৩), হাই-টেক পার্কগুলোর উপস্থিতি এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মিলনস্থলে কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, যা বঙ্গোপসাগরীয় করিডোর হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করেছে (৪)।
বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সমীকরণে তাইওয়ানের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের ৯০ শতাংশের বেশি উন্নত প্রসেসর তাইওয়ানে উৎপাদিত হয়, যার মূল নিয়ন্ত্রক টিএসএমসি। অ্যাপল, এসভিডিআইএ, এএমডি, কুয়ালকম-এর মতো সংস্থাগুলো চিপ নকশা ও ফ্যাব্রিকেশনের জন্য টিএসএমসির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতা থেকে উদ্ভূত ‘সিলিকন শিল্ড’ ধারণা অনুযায়ী, তাইওয়ানের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অস্তিত্বের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে, যা তাইওয়ানকে চীনের সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসন থেকে রক্ষা করছে বলে মনে করা হয়। তবে ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, ইউক্রেন যুদ্ধের মতো ঘটনা প্রমাণ করে যে অর্থনৈতিক ঝুঁকির পরও রাষ্ট্রগুলো সামরিক অভিযানে লিপ্ত হতে পারে, তাই ‘সিলিকন শিল্ড’ চূড়ান্ত সামরিক নিশ্চয়তা দেয় না।
২০১৮ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তি আধিপত্য নিয়ে সংঘাত চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা এখন বিশ্ব-আধিপত্যের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘চিপস ও বিজ্ঞান আইন (২০২২)’ ৫২ বিলিয়ন ডলারের বেশি রাষ্ট্রীয় অনুদান ও প্রণোদনা দিয়ে নিজ দেশে চিপ ফ্যাব্রিকেশন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে, চীন যেন উন্নত এআই চিপ এবং নেদারল্যান্ডসের এএসএমএল নির্মিত অতিরশ্মি লিথোগ্রাফি (ইইউভি) প্রযুক্তি না পায়, তার জন্য কঠোর রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায়, চীন আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের অংশ হিসেবে এমআইসি ও লিথোগ্রাফি সরঞ্জাম তৈরির ওপর জোর দিচ্ছে এবং ব্রিকস ও বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর মাধ্যমে নিজস্ব ডিজিটাল ও প্রযুক্তি বাজার সুরক্ষার চেষ্টা করছে।
এই বৈশ্বিক প্রোপটে ২০২৬ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম ও বিয়ার সামিট ২০২৬ (National Semiconductor Symposium & BEAR Summit 2026) আপাতদৃষ্টিতে একটি সাধারণ ঘরানার প্রযুক্তি সম্মেলন মনে হলেও, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূরাজনীতি বিশ্লেষকদের চোখে এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। তবে এই আয়োজন এমন একসময়ে ঘটল, যখন বিশ্বরাজনীতি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার তীব্র চিপযুদ্ধের উত্তাপে উত্তপ্ত, আর সেই যুদ্ধের একদম কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে এক ছোট্ট দ্বীপ-তাইওয়ান।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বৈরথ : চিপস অ্যাক্ট বনাম ‘মেড ইন চায়না ২০২৫’





