সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। দেশের সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা, রাজস্ব পরিস্থিতি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর এই বেতন কাঠামোর সম্ভাব্য চাপের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) নতুন এই বেতন কাঠামো অন্তত দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে। তবে সরকার আইএমএফের এই সুপারিশ পুরোপুরি মেনে নিতে রাজি নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে বাস্তবায়নের কৌশল নির্ধারণের নির্দেশনা দিয়েছেন।
সম্প্রতি ঢাকা সফরকালে আইএমএফ প্রতিনিধি দল অর্থ বিভাগের সঙ্গে বৈঠকে নতুন পে-স্কেলের আর্থিক প্রভাব নিয়ে তাদের উদ্বেগের কথা জানায়। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করা হলে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে। এর ফলে বাজেট ঘাটতি, মূল্যস্ফীতি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে আইএমএফ অন্তত দুই বছর সময় নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে।
আগামী অক্টোবরে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভায় বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর নভেম্বরে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে এসে নতুন ঋণ কর্মসূচির পাশাপাশি নবম পে-স্কেল নিয়েও বিস্তারিত আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে সরকার চেষ্টা করছে ওই বৈঠকের আগেই পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে, যাতে বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না আসে।
রোববার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী এক বৈঠকে সচিব কমিটির সুপারিশ ও প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোর প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অর্থমন্ত্রী সভায় নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও ব্যয় ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। অর্থ বিভাগ ইতিমধ্যে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে এবং চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে বা আগামী সপ্তাহের যেকোনো মন্ত্রিসভা বৈঠকে এটি অনুমোদনের জন্য তোলা হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকার নীতিগতভাবে পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে চায় না। তবে একবারে বাস্তবায়নের পরিবর্তে ধাপে ধাপে কার্যকরের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। ২০১৫ সালে অষ্টম পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার পর এক দশকের বেশি সময় পার হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে মূল্যস্ফীতি, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন বেতন কাঠামোর দাবি জানিয়ে আসছেন। বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং কয়েক লাখ পেনশনভোগী নতুন এই পে-স্কেলের আওতায় আসার অপেক্ষায় আছেন।
বাংলাদেশ বর্তমানে আইএমএফের ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে এবং ৬.৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে। এই প্রেক্ষাপটে আইএমএফ চাচ্ছে, সরকার যেন নতুন কোনো বড় ব্যয় বাড়ানোর আগে রাজস্ব সক্ষমতা ও বাজেট ঘাটতির ঝুঁকি সতর্কতার সাথে বিবেচনা করে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে। এই প্রেক্ষাপটে আইএমএফ চাইছে, সরকার যেন বড় ধরনের পুনরাবৃত্তির ব্যয় বাড়ানোর আগে রাজস্ব সক্ষমতা, বাজেট ঘাটতি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ঝুঁকি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করে।





