লবণের দুই পিঠ: রান্নার স্বাদ বনাম মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি

প্রকাশ:

রান্নাঘরে রাখা ছোট্ট কাচের বয়ামের সাদা দানাগুলো ছাড়া আমাদের এক দিনও চলে না। সকালের ডিমভাজি থেকে শুরু করে দুপুরের রাজকীয় মহাভোজ—সবকিছুতেই প্রয়োজন লবণ। লবণ কেবল একটি উপাদান নয়, এটি তরকারির প্রাণ। স্বাদহীন খাবারকে এক নিমিষে অমৃত করে তোলার জাদু রয়েছে এই লবণের। কিন্তু এই জাদুর পেছনেই লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার অধ্যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, যে লবণ আমাদের জিভে স্বাদ আনে, সেই লবণই অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ করলে শরীরের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই লবণকে বলা চলে এক ‘দুধারী তলোয়ার’—যার এক পিঠে রয়েছে স্বাদ, অন্য পিঠে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি। আদিমকাল থেকেই মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের সঙ্গে লবণ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

লবণের রাসায়নিক নাম সোডিয়াম ক্লোরাইড (NaCl)। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ সোডিয়াম এবং ৬০ শতাংশ ক্লোরাইড থাকে। আমাদের শরীর নিজে থেকে সোডিয়াম তৈরি করতে পারে না, তাই এটি খাবার থেকে গ্রহণ করতে হয়। মানবদেহের জন্য সোডিয়াম একটি অত্যন্ত জরুরি খনিজ। এর প্রধান কাজগুলো হলো শরীরের কোষে এবং রক্তে পানির সঠিক পরিমাপ বজায় রাখা, মস্তিষ্ক থেকে শরীরের অন্যান্য অংশে সংকেত বা বার্তা আদান-প্রদান করা এবং হৃৎপিণ্ডসহ শরীরের সব পেশির স্বাভাবিক সংকোচন ও প্রসারণ নিয়ন্ত্রণ করা। সুতরাং লবণ ছাড়া আমাদের বেঁচে থাকা অসম্ভব। শরীরে সোডিয়ামের তীব্র অভাব হলে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘হাইপোনাট্রেমিয়া’ বলা হয়, মানুষ অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।

লবণ শরীরের জন্য যতটা প্রয়োজনীয়, এর অতিরিক্ত ব্যবহার ঠিক ততটাই বিপজ্জনক। আধুনিক যুগে আমাদের খাদ্যতালিকায় প্রক্রিয়াজাত খাবারের আধিক্যের কারণে আমরা প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি লবণ খাচ্ছি। এই অতিরিক্ত লবণ আমাদের শরীরে যেসব দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে, তার মধ্যে অন্যতম হলো উচ্চ রক্তচাপ। রক্তে সোডিয়ামের পরিমাণ বেড়ে গেলে তা পানিকে ধরে রাখে, ফলে রক্তের সামগ্রিক আয়তন বা ভলিউম বেড়ে যায়। এই বাড়তি রক্ত যখন সরু রক্তনালির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন রক্তনালির দেওয়ালে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। একেই আমরা বলি উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাড প্রেশার। উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’, কারণ এটি ভেতরে ভেতরে শরীরকে শেষ করে দিলেও বাইরে থেকে সহজে কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না।

উচ্চ রক্তচাপের সরাসরি প্রভাব পড়ে আমাদের হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কে। দীর্ঘদিন ধরে রক্তচাপ বেশি থাকলে হৃৎপিণ্ডের ধমনিগুলো শক্ত ও সংকীর্ণ হয়ে যায়, ফলে হার্ট অ্যাটাক এবং হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। একইভাবে মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে গিয়ে বা ব্লক হয়ে মানুষ স্ট্রোকের শিকার হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বব্যাপী স্ট্রোক এবং হৃদরোগে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ। এছাড়া আমাদের কিডনি বা বৃক্ক শরীরের ফিল্টার হিসেবে কাজ করে, যা রক্ত থেকে অতিরিক্ত বর্জ্য এবং তরল ছেঁকে প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। কিন্তু রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা বেশি থাকলে কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ধীরে ধীরে কিডনির ফিল্টার করার ক্ষমতা কমে যায়, যার ফলে শরীর থেকে পানি বের হতে পারে না, হাত-পা ফুলে যায় এবং একপর্যায়ে কিডনি সম্পূর্ণ বিকল (Kidney Failure) হয়ে যেতে পারে।

লবণের সঙ্গে হাড়ের স্বাস্থ্যের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শরীর যখন প্রস্রাবের মাধ্যমে অতিরিক্ত সোডিয়াম বের করে দেয়, তখন সোডিয়ামের সঙ্গে শরীরের জরুরি ক্যালসিয়ামও বের হয়ে যায়। রক্তে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি মেটাতে শরীর তখন হাড় থেকে ক্যালসিয়াম টেনে নেয়। ফলে হাড় দুর্বল, ভঙ্গুর ও পাতলা হয়ে যায়, যাকে চিকিৎসা পরিভাষায় ‘অস্টিওপরোসিস’ (Osteoporosis) বলা হয়। এছাড়া অতিরিক্ত লবণাক্ত খাবার, যেমন লবণ দিয়ে সংরক্ষিত মাছ-মাংস বা আচার, পাকস্থলীর ভেতরের নরম দেয়ালে ক্ষত বা প্রদাহ সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিন এই অবস্থা চলতে থাকলে পাকস্থলীতে আলসার এবং পরবর্তী সময়ে পাকস্থলীর ক্যানসার (Stomach Cancer) হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দিনে পাঁচ গ্রামের কম (এক চা চামচের কম) লবণ খাওয়া উচিত। এর মধ্যে সোডিয়ামের পরিমাণ থাকে প্রায় দুই হাজার মিলিগ্রাম। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতে মানুষ দৈনিক গড়ে ১০ থেকে ১২ গ্রাম লবণ খায়, যা নিরাপদ সীমার দ্বিগুণেরও বেশি। আমাদের দেশে ভাতের পাতে আলাদা করে কাঁচা লবণ খাওয়ার একটি মারাত্মক ক্ষতিকর অভ্যাস রয়েছে। অনেকে মনে করেন, লবণ ভেজে বা তরকারিতে ফুটিয়ে খেলে ক্ষতি কম হয়। এটি সম্পূর্ণ একটি ভুল ধারণা বা কুসংস্কার। লবণ কাঁচা হোক আর পাকা (রান্না করা), সোডিয়ামের রাসায়নিক গঠন একই থাকে। তাই পাতে বাড়তি লবণ নেওয়া যেকোনো অবস্থাতেই বর্জনীয়।

খ. হৃদরোগ ও স্ট্রোক (Heart Disease and Stroke)

গ. কিডনির কার্যক্ষমতা নষ্ট হওয়া (Kidney Damage)

শেয়ার করুন