কঙ্গোয় ইবোলা প্রাদুর্ভাবের ভয়াবহ বিস্তার, পাঁচ দিনে মৃত্যু বাড়ল ৪০ শতাংশ

প্রকাশ:

গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআর কঙ্গো) চলমান ইবোলা প্রাদুর্ভাব অত্যন্ত উদ্বেগজনকভাবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই প্রাণঘাতী ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৩৫৪ জনে দাঁড়িয়েছে। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে মৃত্যুর এই হার ৪০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। শনিবার প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, মৃতসহ নিশ্চিত আক্রান্তের মোট সংখ্যা বেড়ে ৩ হাজার ৭৫ জনে পৌঁছেছে, যা এক সপ্তাহ আগের তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি দেশটিতে ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ইবোলা মহামারিতে পরিণত হয়েছে।

পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে বুন্ডিবুগিও ধরনের ইবোলা ভাইরাস, যা মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ঘটানো চারটি পরিচিত প্রজাতির মধ্যে সবচেয়ে বিরল। এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনো কোনো অনুমোদিত টিকা বা কার্যকর চিকিৎসা নেই। আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (আফ্রিকা সিডিসি) জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবদুলসালামি নাসিদি জানান, কার্যকর টিকার অভাব ও সংঘাতপূর্ণ এলাকায় প্রাদুর্ভাব ঘটায় ভাইরাসটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সম্পদেরও ঘাটতি রয়েছে।

তবে টিকা উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রুপ জানিয়েছে, পরীক্ষামূলক বুন্ডিবুগিও ইবোলা টিকার প্রথম ডোজ শুক্রবার একজন স্বেচ্ছাসেবকের শরীরে প্রয়োগ করা হয়েছে। গবেষণা প্রধান ক্যাটরিনা পোলক একে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার একটি মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন। এদিকে আফ্রিকা সিডিসির মহাপরিচালক জ্যাঁ কাসেয়া সতর্ক করে বলেছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এটি বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ইবোলা প্রাদুর্ভাবে রূপ নিতে পারে।

মাঠ পর্যায়ে পরিস্থিতি বেশ প্রতিকূল। আল জাজিরার গোমা প্রতিনিধি আলাঁ উয়াইকানি জানিয়েছেন, সরকারের প্রতিক্রিয়ায় সমন্বয় ও দ্রুততার অভাব রয়েছে। গত মে মাসে প্রাদুর্ভাব ঘোষণার পর থেকে অন্তত ৩৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী মারা গেছেন এবং ১০০ জনের বেশি আক্রান্ত হয়েছেন। শনিবারও এক চিকিৎসক ও এক স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর পাশাপাশি সুরক্ষা সামগ্রীর সংকট এবং স্থানীয়দের মধ্যে রোগটির অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহের মনোভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।

ইতুরি প্রদেশের বুনিয়া ও রওয়ামপারা জেনারেল হাসপাতালের মতো বড় চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে স্বাস্থ্যকর্মীরা ধর্মঘট শুরু করেছেন। অনিরাপদ কর্মপরিবেশ ও বকেয়া ভাতার প্রতিবাদে তারা কাজ বন্ধ রেখেছেন। মার্টিন বোলোম্বি নামক এক ধর্মঘটকারী স্বাস্থ্যকর্মী অভিযোগ করেন, প্রাপ্য অর্থ না পাওয়ায় তাদের মনোবল ভেঙে পড়েছে এবং চিকিৎসাকেন্দ্রে রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস সতর্ক করেছেন যে, নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো সম্ভব না হওয়ায় প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। যদিও প্রায় ৮০ শতাংশ সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের নজরদারিতে আনা সম্ভব হয়েছে, তবুও অনেক গ্রাম এখনো সেবার বাইরে। টেড্রোস সংঘাত বন্ধে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, কেবল চিকিৎসাসামগ্রী দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। নতুন প্রদেশে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আগেই মানবিক সহায়তা ও চিকিৎসা কার্যক্রম চালানোর জন্য নিরাপদ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা ডিআর কঙ্গো থেকে আসা ব্যক্তিদের প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

শেয়ার করুন