সাতক্ষীরার ৬৮ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী সাইদ উদ্দীন (ছদ্মনাম) নিয়মিত স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। অবসর সময়ে তিনি ফেসবুক বা ইউটিউবে ভিডিও দেখেন, কিন্তু এই ফোনের মাধ্যমে অনলাইন ব্যাংকিং, সরকারি সেবা গ্রহণ বা কৃষিতথ্য জানার বিষয়ে তিনি অবগত নন। সাইদ উদ্দীনের মতো অসংখ্য মানুষ বাংলাদেশে রয়েছেন, যারা প্রযুক্তি হাতে থাকা সত্ত্বেও এর বহুমুখী সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) সর্বশেষ ডিজিটাল অগ্রগতি সূচকে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার পেছনে এটি একটি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
চলতি মাসে প্রকাশিত এই সূচকে ২০২৪ সালের তথ্য ব্যবহার করে বিশ্বের ১৫৯টি দেশের আইসিটি পরিষেবার অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশের স্কোর ৬৮ দশমিক ৯, যা আগের বছরের ৬৪ দশমিক ৯ থেকে কিছুটা বাড়লেও প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় তা বেশ কম। তালিকায় ভিয়েতনামের স্কোর ৮৮ দশমিক ৪, ভুটানের ৮৬ দশমিক ৪, কম্বোডিয়ার ৭৮ দশমিক ৭, শ্রীলঙ্কার ৭৩ দশমিক ২ এবং মিয়ানমারের ৭১ দশমিক ৬। বাংলাদেশের নিচে রয়েছে পাকিস্তান (৬৭ দশমিক ৭) এবং আফগানিস্তান (৩৬ দশমিক ২)।
আইটিইউর প্রতিবেদনে ডিজিটাল অগ্রগতিকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে—‘অর্থবহ সংযোগ’ ও ‘সর্বজনীন সংযোগ’। বাংলাদেশ অর্থবহ সংযোগে ৮৭ দশমিক ১ স্কোর পেলেও সর্বজনীন সংযোগে পেয়েছে মাত্র ৫০ দশমিক ৬। বিশ্লেষকদের মতে, দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ফোর-জি নেটওয়ার্কের ব্যাপক বিস্তার ঘটলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে, শিক্ষা বা ব্যবসায় ইন্টারনেটের ব্যবহার আশানুরূপ নয়, যাকে ‘ইউসেজ গ্যাপ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশের ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ থ্রি-জি এবং ৯৯ দশমিক ৬ শতাংশ ফোর-জি নেটওয়ার্কের আওতায় থাকলেও মাত্র ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। এছাড়া ৫৫ দশমিক ১ শতাংশ পরিবারের বাড়িতে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির মনে করেন, শুধু অবকাঠামো গড়লেই চলবে না, বরং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় এবং মানুষের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। তার মতে, দেশে অটোমেশন ও সফটওয়্যারের ব্যবহার বাড়লেও আন্তর্জাতিক সূচকে তার প্রতিফলন ঘটছে না কারণ সেবাগুলো মানুষের কাছে সহজবোধ্য নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, আইসিটি অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে নাগরিক সেবার মান ও অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার সময় এসেছে। ডিজিটাল বৈষম্য কমিয়ে সব স্তরের মানুষকে এই অগ্রযাত্রায় যুক্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
আইটিইউর প্রতিবেদনে সমস্যা চিহ্নিত করার পাশাপাশি উত্তরণের পথও দেখানো হয়েছে। সংস্থাটি সর্বজনীন সংযোগ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এছাড়া শুধু মোবাইল ইন্টারনেটের ওপর নির্ভর না করে ফিক্সড ব্রডব্যান্ডের বিস্তার এবং ডিজিটাল দক্ষতা ও সাইবার নিরাপত্তার বিষয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে সঠিক নীতি নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশে ডিজিটাল লেনদেন করেন ৩৪ শতাংশ মানুষ।





