২০২৪ সালের ১৪ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ ও ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলে আখ্যা দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংবাদ সম্মেলনে তার এই মন্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের দমনের এক ধরনের বৈধতা দেওয়া হয়, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। এই বক্তব্যের পরপরই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংসদ’ ফেসবুক গ্রুপের আহ্বানে রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হন। এ সময় তারা ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’, ‘মেধা না কোটা, মেধা মেধা’ এবং ‘তুমি কে, আমি কে—রাজাকার, রাজাকার’ স্লোগানে ক্যাম্পাস প্রকম্পিত করে তোলেন। প্রতিবাদ ঠেকাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় এবং হলগুলোর ফটকে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা শিক্ষার্থীদের বাধা দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো ভূমিকা না থাকলেও, কোটাবিরোধী আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের তিন নেতা মাছুম শাহরিয়ার, রাতুল আহামেদ শ্রাবণ ও আশিকুর রহমান জিম পদত্যাগ করেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও বিক্ষোভের সময় রাত সাড়ে ১১টার দিকে কাটা পাহাড় সড়কে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে এক ছাত্রীসহ অন্তত দুজন আহত হন এবং রাত ১টা পর্যন্ত ছাত্রলীগ ক্যাডাররা জিরো পয়েন্টে অবস্থান নেয়। এছাড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও মধ্যরাতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেন।
এদিকে, ১৪ জুলাই ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে শিক্ষার্থীরা বঙ্গভবন অভিমুখে গণপদযাত্রা করেন। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, প্রেস ক্লাব, শিক্ষা ভবন ও জিপিওর সামনে পুলিশের একাধিক ব্যারিকেড ভেঙে শিক্ষার্থীরা গুলিস্তান মোড়ে পৌঁছান। সেখানে সাঁজোয়া যান ও জলকামান নিয়ে পুলিশ অবস্থান নিলেও ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম জানান, তারা জরুরি সংসদ অধিবেশন ডেকে কোটা সংস্কারের আইন প্রণয়ন এবং শাহবাগ থানায় দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। সরকার ও প্রশাসনের কাছে তারা ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম ঘোষণা করেন।
একই দাবিতে দেশের বিভিন্ন জেলায় শিক্ষার্থীরা গণপদযাত্রা ও স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি পালন করেন। রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, রংপুর, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, পটুয়াখালী, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও পাবনাসহ বিভিন্ন জেলায় শিক্ষার্থীরা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দেন। এছাড়া বরিশাল, কুমিল্লা, নোয়াখালী, বগুড়া, সুনামগঞ্জ, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, নারায়ণগঞ্জ ও চাঁদপুরেও একই কর্মসূচি পালিত হয়। আন্দোলনের ১৪তম দিনে এই স্মারকলিপি প্রদান ও আলটিমেটাম ঘোষণার মাধ্যমে কোটা সংস্কার আন্দোলন একটি নতুন ও উত্তাল পর্যায়ে প্রবেশ করে।




