উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশ হিসেবে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা সীমিত হলেও নিজস্ব সম্পদ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। দুর্যোগ মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে; প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট যেমন ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা ভূমিকম্প এবং মানবসৃষ্ট যেমন শিল্প দুর্ঘটনা বা পরিবেশ দূষণ। এই আকস্মিক বিপর্যয়গুলো মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, সমাজ ও অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা অনেক সময় নিজস্ব সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী, সমন্বিত ও লক্ষ্যভিত্তিক করার লক্ষ্যে ২০১২ সালে ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন’ প্রণয়ন করা হয়। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের দক্ষতা বাড়ানো এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রদান। আইনের সংজ্ঞায় দুর্যোগ বলতে প্রকৃতি বা মানুষের সৃষ্ট এমন ঘটনাকে বোঝানো হয়েছে, যার ভয়াবহতা আক্রান্ত এলাকার জনজীবন, গবাদিপশু, পরিবেশ ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে এবং যার মোকাবিলায় স্থানীয় সক্ষমতা যথেষ্ট নয়। এর মধ্যে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক ঘটনার পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ড, রাসায়নিক বিস্ফোরণ, মহামারি এবং অবকাঠামোগত অকার্যকারিতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইনটিতে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ৪১ সদস্যবিশিষ্ট ‘জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিল’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এই কাউন্সিলের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে দুর্যোগ মোকাবিলায় কৌশলগত দিকনির্দেশনা প্রদান, নীতিমালা বাস্তবায়ন, ঝুঁকি হ্রাস কার্যক্রমের মূল্যায়ন এবং সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা। এছাড়া দুর্যোগ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সেমিনার বা কর্মশালা আয়োজনে নির্দেশনা দেওয়াও এই কাউন্সিলের অন্যতম কাজ।
আইনটি অমান্য করা বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, মিথ্যে তথ্য প্রদান, সম্পদের অপব্যবহার কিংবা দুর্যোগকালীন সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ানোর মতো কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এমন অপরাধের জন্য এক থেকে তিন বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবে জেলা প্রশাসক বা তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধির লিখিত অভিযোগ ছাড়া কোনো আদালত এই আইনের অধীনে মামলা গ্রহণ করতে পারবে না এবং সকল অপরাধ অআমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও অআপসযোগ্য হবে।
দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সতর্কতা অবলম্বন এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি। বন্যা বা ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসে বাড়ি বা এলাকাভিত্তিক জরুরি পরিকল্পনা তৈরি, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা এবং নিরাপদ আশ্রয়স্থল নির্বাচন করার মতো পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনেক সহজতর হবে।




