বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলজুড়ে বজ্রপাত এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। খোলা মাঠ আর অথৈ জলরাশির এই জনপদে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন প্রান্তিক কৃষক, জেলে ও নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ। জেলা প্রশাসনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত সাড়ে পাঁচ বছরে এই জেলায় বজ্রপাতে অন্তত ৬০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে চলতি ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসেই (জুলাই পর্যন্ত) মারা গেছেন ১৩ জন। বিগত বছরগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালে ১৫ জন, ২০২২ সালে ৩ জন, ২০২৩ সালে ১২ জন, ২০২৪ সালে ৫ জন এবং ২০২৫ সালে ১২ জন বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন।
বজ্রপাতের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে খালিয়াজুরী, মদন, মোহনগঞ্জ, কেন্দুয়া, পূর্বধলা ও সদর উপজেলার হাওরাঞ্চল। গত ১৮ জুন এক দিনেই জেলায় তিনটি পৃথক বজ্রপাতের ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়। ভোরের বৃষ্টিতে মাছ ধরতে গিয়ে মদনের জয়পাশা গ্রামের ইটভাটা শ্রমিক রাজিব মিয়া (২৪), কেন্দুয়াপাড়ার মোড়াইল বিলে মাছ ধরার সময় শামসুল হুদা (৫৫) এবং সান্দিকোনা এলাকায় আশরাফুল ইসলাম (২৫) নামের এক যুবক বজ্রাঘাতে প্রাণ হারান। এসব পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে তাদের জীবনে নেমে এসেছে চরম অন্ধকার।
খালিয়াজুরীর মেন্দিপুর গ্রামের কৃষক সামছুল হক জানান, হাওরে কাজ করার সময় হঠাৎ মেঘ জমলে আশেপাশে আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো উঁচু জায়গা বা ঘর না থাকায় চরম আতঙ্কের মধ্যে কাজ করতে হয়। একই ঝুঁকির মুখে থাকেন জেলেরা। নেত্রকোনা কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ইনচার্জ মো. মামুন জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বায়ুমণ্ডলে অস্থিতিশীলতা বাড়ছে এবং কিউমুলোনিম্বাস মেঘ থেকে বজ্রপাতের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ করে হাওর এলাকায় তালগাছসহ প্রচুর উঁচু গাছ লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জানান, বিশাল হাওর এলাকায় কেবল বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করে সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়। উন্মুক্ত মাঠে কর্মরত কৃষক ও জেলেদের সুরক্ষার জন্য বিশেষ ‘শেল্টার জোন’ বা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা প্রয়োজন। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে এবং প্রস্তাবিত আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থার পাশাপাশি জরুরি সুযোগ-সুবিধা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। দ্রুতই মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষজ্ঞ দল সরেজমিনে এসে কারিগরি দিক ও স্থান নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করবে।




