২৩ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মিথ্যা বলতে মানুষের বেশি মানসিক পরিশ্রম করতে হয়, জানাচ্ছে গবেষণা

প্রকাশ:

দৈনন্দিন জীবনে এমন অনেক মানুষের মুখোমুখি হতে হয়, যাঁরা অত্যন্ত নিপুণভাবে মিথ্যা বলেন। ওপর থেকে শান্ত দেখালেও মিথ্যা বলার সময় একজন মানুষের মনের ভেতর কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে বা কতটা মানসিক পরিশ্রম হয়, তা নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। জার্মানির মারবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক তাবেয়া ভেখটারশয়জার ও ক্রিস্টিনা জুখোৎস্কির ২০২৬ সালের এক গবেষণা বলছে, সত্য বলার তুলনায় মিথ্যা সাজিয়ে বলতে মানুষকে তুলনামূলক বেশি মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও মানসিক কষ্ট পোহাতে হয়। আমাদের আশপাশেই এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের আমরা সত্যবাদী, বিশ্বস্ত বলে জানি; অথচ তাঁদের কেউ কেউ হয়তো এমন নিপুণভাবে মিথ্যা বলেন যে সন্দেহ করারও সুযোগ থাকে না। কারণ, তিনি সাধারণত কীভাবে কথা বলেন, কেমন আচরণ করেন, সে সম্পর্কে আমাদের ধারণা থাকে। এই মানুষগুলোর মনের ভেতরটা আদতে কেমন। কিছু মানুষ কথার জালে অন্যকে আটকে ফেলতে সিদ্ধহস্ত। আর কীভাবেই–বা বোঝা সম্ভব, কেউ মিথ্যা বলছেন কি না।

গবেষকদের মতে, সত্য গোপনের সময় মানুষকে মূল ঘটনা চেপে রেখে নতুন একটি বিশ্বাসযোগ্য বক্তব্য দাঁড় করাতে হয়। এতে আগের কথার সঙ্গে মিল রাখা ও অসংগতি এড়ানোর মানসিক চেষ্টা চালাতে হয়। গবেষণায় মিথ্যা বলার পুরো প্রক্রিয়াকে বোঝাতে ‘অ্যাকটিভেশন–ডিসিশন–কনস্ট্রাকশন–অ্যাকশন’ নামের একটি তাত্ত্বিক মডেল ব্যবহার করা হয়েছে।

মিথ্যা বলার চার ধাপ

  • সত্য মনে করাঘটনার প্রকৃত সত্য বা আসলে কী ঘটেছিল, তা স্মরণে আনা।
  • সিদ্ধান্ত নেওয়াপরিস্থিতি বিবেচনায় সত্য বলবেন নাকি মিথ্যা বলবেন, তা নির্ধারণ করা।
  • মিথ্যা সাজানোসত্যের বদলে অন্য কোন কাল্পনিক বক্তব্য বলবেন, তা তৈরি করা।
  • মিথ্যা বলাসাজানো বক্তব্যটি অন্যের সামনে উপস্থাপন করা।

এই চারটি ধাপ সফলভাবে পার করতে হলে গভীর চিন্তাভাবনা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন পড়ে। মিথ্যা বলার প্রক্রিয়ার সঙ্গে ভয়, অপরাধবোধ কিংবা উদ্বেগের মতো মানসিক অনুভূতি যুক্ত হলে কাজটি আরও বেশি কঠিন হয়ে ওঠে। এ ছাড়া নিজের বলা মিথ্যা কথাটি মনে রাখা এবং পরবর্তীতে একই প্রসঙ্গ এলে আগের বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করা জরুরি হয়ে পড়ে। ফলে একটি মিথ্যা ঢাকতে গিয়ে প্রায়ই একাধিক নতুন মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়।

গবেষকেরা মোট ৯৭ জনের ওপর দুটি পৃথক পরীক্ষা পরিচালনা করেন। এর মধ্যে প্রথম পরীক্ষায় ৪৯ জন এবং দ্বিতীয় পরীক্ষায় ৪৮ জন অংশ নেন। গবেষণার অংশ হিসেবে অংশগ্রহণকারীদের একটি কৃত্রিম অপরাধমূলক পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়। প্রথম খেলায় একটি ইউএসবি স্টিক বদলে ফেলা এবং দ্বিতীয়টিতে খাম থেকে ১ হাজার ইউরো সরিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা সাজানো হয়েছিল।

এরপর একটি কম্পিউটারের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের নানা প্রশ্ন করা হয়। সেখানে দৈনন্দিন সাধারণ বিষয়ের পাশাপাশি ওই কাল্পনিক অপরাধ সম্পর্কেও প্রশ্ন ছিল এবং কোনোটিতে সত্য আবার কোনোটিতে মিথ্যা উত্তর দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। গবেষকেরা পর্যবেক্ষণ করেন, কোন উত্তর দিতে কত সময় লাগছে এবং উত্তরদাতারা ঠিক কতটা মানসিক ও আবেগগত চাপ অনুভব করছেন।

পরীক্ষায় দেখা গেছে, সত্য উত্তরের চেয়ে মিথ্যা উত্তর দিতে অংশগ্রহণকারীদের বেশি সময় লেগেছে এবং তাঁরা মানসিক ও আবেগগত অস্বস্তি বেশি প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে সত্য তথ্যটি চেপে রাখা এবং সত্য থেকে মিথ্যায় রূপান্তরের প্রক্রিয়াটিকে তাঁরা বেশ জটিল বলে উল্লেখ করেছেন। সাধারণ প্রশ্নের চেয়ে কাল্পনিক অপরাধসংক্রান্ত প্রশ্নের ক্ষেত্রে দ্বিধা ও চাপ আরও বেশি ছিল। পরীক্ষার শুরুতে অংশগ্রহণকারীদের কাল্পনিক অপরাধের পরিস্থিতিতে রাখা হয়।

তবে গবেষকেরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, এই পর্যবেক্ষণটি কৃত্রিম ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে করা হয়েছে।

তাই বাস্তব জীবনে সব মানুষের ক্ষেত্রে একই রকম আচরণ দেখা যাবে—এমন সিদ্ধান্ত টানা যাবে না। বাস্তবে পরিচিত মানুষের হঠাৎ দ্বিধাগ্রস্ততা, উত্তর দিতে দেরি হওয়া বা অস্বাভাবিক আচরণ দেখে সন্দেহ তৈরি হতে পারে। কিন্তু কেবল বাহ্যিক অস্থিরতা বা চোখের দৃষ্টি এড়ানোর মতো ভঙ্গি দেখে কাউকে সরাসরি মিথ্যাবাদী বলা যুক্তিযুক্ত নয়। কারণ লজ্জা, ভয় কিংবা কঠিন কোনো সত্য প্রকাশের চাপের কারণেও মানুষ একই রকম আচরণ করতে পারে।

অন্যদিকে, যাঁদের অভ্যাসগতভাবে মিথ্যা বলার অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাঁরা নিজেদের আবেগ ও কথা নিয়ন্ত্রণে বেশ দক্ষ হতে পারেন। ফলে শুধুই শারীরিক অঙ্গভঙ্গি দেখে মিথ্যা শনাক্ত করার নিখুঁত কোনো নিয়ম এই গবেষণা প্রতিষ্ঠা করে না। বরং ব্যক্তির কথায় অসংগতি রয়েছে কি না বা আগের বক্তব্যের সঙ্গে তার মিল আছে কি না, তা যাচাই করাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি। কগনিশন অ্যান্ড ইমোশন এবং সাইকোলজি টুডেতে প্রকাশিত আলোচনা থেকে এসব মনস্তাত্ত্বিক তথ্য জানা গেছে।

শেয়ার করুন