গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শ্রমিকদের দাবি, ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। শনিবার বিকেলে এই বিক্ষোভে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন এবং পুলিশের একটি গাড়িসহ প্রায় ১৫টি যানবাহন ভাঙচুর করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। অথচ আমাদের বেতন সেই আগের জায়গায় পড়ে আছে। আমরা কাজ করতে চাই, কিন্তু পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার মতো বেতনও তো পেতে হবে।’। দাবি না মানা হলে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।’। এ সময় কমপক্ষে ৩০ জন আহত হয়েছেন। পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় ৩০ জন শ্রমিক ও পুলিশের সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সহিদুল ইসলাম। ডিভাইন টেক্সটাইল কারখানার শ্রমিক কবির হোসেন বলেন, ‘পুলিশের লাঠিপেটায় আমাদের ২০-২৫ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন। খবর পেয়ে থানা-পুলিশ ও শিল্প পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। আজ চলে গেলেও কাল (রোববার) সকাল থেকে আবার আমাদের আন্দোলন শুরু হবে।’। পোশাকশ্রমিকেরা প্রায়ই এভাবে রাস্তা বন্ধ করে রাখলে আমাদের কী হবে।
বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় শনিবার দুপুরে কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার ইন্টারস্টপ কারখানার শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের মাধ্যমে। ধীরে ধীরে এর সাথে পার্শ্ববর্তী ডিভাইন টেক্সটাইল কারখানার শ্রমিকরাও যোগ দেন। বেলা আড়াইটার দিকে তারা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অবস্থান নিলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। বিক্ষোভের জেরে আশপাশের অন্তত ২০টি কারখানা কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। পরে আরও আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা বিক্ষোভে অংশ নেন। পরে আশপাশের ময়লা-আবর্জনার বস্তা রাস্তায় ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করেন তাঁরা।
আন্দোলনরত শ্রমিকরা জানান, বাজারে চাল, ডাল ও তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতিতে বর্তমান বেতনে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম বাড়লেও তাঁদের বেতন বাড়েনি।
ইন্টারস্টপ কারখানার লাইনম্যান আমিনুল ইসলাম বলেন, পরিশ্রম অনুযায়ী যে বেতন পাওয়া যায় তা দিয়ে মাসের খরচ মেটানো কঠিন। এছাড়া ওভারটাইমের সুযোগ কমে যাওয়ায় তাদের আর্থিক সংকট আরও তীব্র হয়েছে। পারভীন আক্তার নামে আরেক শ্রমিক জানান, সন্তানদের পড়াশোনা ও ঘরভাড়ার খরচ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা, তাই এই বেতন বৃদ্ধি এখন তাদের টিকে থাকার দাবি। একই কারখানার সুইং অপারেটর পারভীন আক্তার বলেন, ‘বাড়িভাড়া, বাজার খরচ, সন্তানের পড়াশোনা—সবকিছু সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আগে ওভারটাইম করে কিছু বাড়তি আয় হতো, এখন সেই সুযোগও কমে গেছে।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন জানান, চন্দ্রা থেকে কোনাবাড়ী পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া শ্রমিক অসন্তোষের কারণে নিরাপত্তার খাতিরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে পুলিশ মহাসড়ক খালি করতে লাঠিপেটা শুরু করলে শ্রমিকরা পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় জড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যা সাতটার দিকে পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং সাড়ে সাতটার নাগাদ যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
শিল্প পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্যমতে, গত দুই সপ্তাহ ধরে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলছে। সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিলেও শ্রমিকদের অসন্তোষ কাটেনি। আহত শ্রমিকরা জানিয়েছেন, পুলিশ ও শ্রমিকদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় অনেকে গুরুতর আহত হয়েছেন।
জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, অবিলম্বে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। তবে তিনি শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দাবি আদায়ে যেন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করা হয়। কোনোভাবেই যেন জানমালের ক্ষতি বা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বাসচালক হারুন মিয়া জানান, অবরোধের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকে যাত্রী নিয়ে আটকে থাকতে হয়েছে। এর আগে গত বৃহস্পতিবারও একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। শ্রমিকদের দাবি না মানলে রবিবার সকাল থেকে পুনরায় আন্দোলনের হুমকি দিয়েছেন স্থানীয় শ্রমিকরা। বর্তমানে কালিয়াকৈর ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশি নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। যাত্রী মো. কাদের মিয়া বলেন, ‘জরুরি কাজে ঢাকায় যাওয়া প্রয়োজন।





