১৪ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মানুষ কি মাংসাশী নাকি নিরামিষাশী? যা বলছে বিজ্ঞান

প্রকাশ:

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই একটি বিতর্ক দেখা যায় যে মানুষ প্রাকৃতিকভাবে নিরামিষাশী নাকি মাংসাশী। এই ইস্যুতে নানা ধরনের মতবাদ প্রচলিত থাকায় সাধারণ মানুষ অনেক সময় বিভ্রান্তিতে পড়েন। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানুষ মূলত সর্বভুক প্রাণী। অর্থাৎ মানুষের শরীর উদ্ভিদ এবং প্রাণিজ—উভয় উৎস থেকে পুষ্টি আহরণ ও হজম করার ক্ষমতা রাখে। মানুষের পূর্বপুরুষদের বিবর্তনীয় ইতিহাস এবং আমাদের দাঁত, চোয়াল ও পরিপাকতন্ত্রের গঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমরা কেবল নিরামিষের ওপর নির্ভরশীল নই।

মানুষের লালারসে থাকা অ্যামাইলেজ এনজাইম শ্বেতসার ভাঙতে সাহায্য করে, আবার পাকস্থলীর হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড প্রোটিন হজমে ভূমিকা রাখে। অনেকে দাবি করেন, মানুষের পাকস্থলীর অ্যাসিড কম বা অন্ত্রের গঠন নিরামিষাশীদের মতো—তবে এসব ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্পূর্ণ। ঘাম নিঃসরণ কিংবা ইউরিক অ্যাসিডের মতো বিষয়গুলো খাদ্যাভ্যাস নির্ধারণের একক মাপকাঠি হতে পারে না। শরীরবিজ্ঞান অনুযায়ী, মানুষের শরীর উভয় ধরনের খাবার গ্রহণের উপযোগী করেই তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের খাদ্যাভ্যাস ও চিকিৎসাভিত্তিক জীবনযাপন নিয়ে আলোচনা। আবার কেউ উৎসাহ দেন প্রচুর মাংস ও চর্বি খেতে। কেউ অসুস্থ হলে তো কথাই নেই—একজন রোগীকে ঘিরে সবাই যেন চিকিৎসক হয়ে ওঠেন। কিন্তু সেগুলোর সবই বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। • লালার অম্লত্ব: মাংসাশী প্রাণীর লালা সব সময় অম্লীয় আর তৃণভোজী প্রাণীর লালা ক্ষারীয়—এমন কোনো সর্বজনীন নিয়ম নেই। • পাকস্থলীর অ্যাসিড: মানুষের পাকস্থলীর অ্যাসিড কম বলে মাছ-মাংস হজম হয় না—এ ধারণা ভুল। শরীরের নিজস্ব পিউরিন বিপাক থেকেও ইউরিক অ্যাসিড উৎপন্ন হয়। • অন্ত্রের দৈর্ঘ্য: অন্ত্রের দৈর্ঘ্যের কোনো নির্দিষ্ট অনুপাত দিয়ে মানুষকে নিরামিষাশী বা মাংসাশী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা যায় না। • ঘাম: ঘাম শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। অর্থাৎ শরীরের এক-দুটি বৈশিষ্ট্য দেখে খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

উদ্ভিজ্জ খাদ্যাভ্যাস দীর্ঘমেয়াদী রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। ২০২৩ সালের একটি মেটা-অ্যানালাইসিসের তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যকর উদ্ভিদভিত্তিক খাবার গ্রহণে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ এবং যেকোনো কারণে অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি যথাক্রমে প্রায় ১৮, ১০ ও ১৬ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, বাদাম ও পূর্ণশস্য খাওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে। বিশেষ করে এসব খাবারে থাকা খাদ্য-আঁশ অন্ত্রের কার্যকারিতা বাড়ায় এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। বরং সঠিকভাবে পরিকল্পিত উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যাভ্যাসও সুস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।

তবে শুধু মাংস বাদ দিলেই খাদ্যাভ্যাস স্বাস্থ্যকর হয়ে যায় না।

অনেকে মাছ-মাংসের বদলে অতিরিক্ত পরিশোধিত শর্করা, মিষ্টি বা ভাজাপোড়া খাবার বেছে নেন, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। প্রাণিজ আমিষের বিকল্প হিসেবে ডাল, ছোলা বা অন্যান্য শস্যজাতীয় খাবার গ্রহণ করলে খাদ্য-আঁশ বাড়ে এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাটের ঝুঁকি কমে। সম্পূর্ণ ভেগান বা নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস অনুসরণের ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ পুষ্টি উপাদানের অভাব হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এর মধ্যে ভিটামিন বি১২, আয়রন, ক্যালসিয়াম, জিঙ্ক ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে ভিটামিন বি১২ নির্ভরযোগ্যভাবে পেতে অনেক সময় ফোর্টিফায়েড খাবার বা সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন পড়ে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়া বেশ সহজ। আমাদের পরিচিত মসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলা ও রাজমা প্রোটিন ও আঁশের চমৎকার উৎস। এছাড়া লালশাক, পালংশাক, পুঁইশাক, লাউ, কুমড়া এবং মৌসুমি সবজি প্রতিদিনের পাতে বৈচিত্র্য আনে। ফলমূলের ক্ষেত্রে পেয়ারা, পেঁপে, কলা ও আম নিয়মিত খাওয়া যেতে পারে। চালের ক্ষেত্রে সাদা চালের পরিবর্তে লাল চাল বা কম পালিশ করা চাল এবং আটার রুটি থেকে বেশি পুষ্টি ও খাদ্য-আঁশ পাওয়া সম্ভব। স্থানীয় কৃষিপণ্য ও স্বাস্থ্যকর শস্যের দিকে নজর দেওয়া পুষ্টি নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।

সবশেষে মনে রাখা জরুরি যে, সবার জন্য একই ধরনের খাদ্যতালিকা কার্যকর নয়। বয়স, শারীরিক গঠন, কাজের ধরন এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থা অনুযায়ী পুষ্টির চাহিদা ভিন্ন হতে পারে। তবে একটি আদর্শ ও সহজ নির্দেশনা হলো—খাবারের প্লেটের অর্ধেক অংশে শাকসবজি ও ফল, এক-চতুর্থাংশ শস্য এবং বাকি এক-চতুর্থাংশ ডাল বা আমিষজাতীয় খাবার রাখা। কোন খাবার প্রাকৃতিক বা দেশি, কেবল তার ওপর ভিত্তি করে সেটিকে স্বাস্থ্যের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ ভাবা ঠিক নয়; খাবারের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিমাণের দিকেও সমান নজর দেওয়া প্রয়োজন।

শেয়ার করুন