১২ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি: তীব্র টানাপোড়েনে দিশাহারা বেসরকারি চাকরিজীবীরা

প্রকাশ:

রাজধানীর কাজীপাড়ায় বসবাসকারী ওয়াসিউর রহমান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর অধীনে কর্মরত আছেন অন্তত ২০ জন কর্মী। পেশাগত প্রয়োজনে তাঁকে প্রতিদিন ঢাকার রাস্তায় ছুটতে হয়, বিভিন্ন গ্রাহকের সঙ্গে বৈঠক করতে হয় এবং মাঠপর্যায়ের কাজের তদারকি করতে হয়। প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজের প্রয়োজনে পোশাকের মান বজায় রাখা, যাতায়াত করা এবং সর্বক্ষণ মুঠোফোন ও ইন্টারনেটে সক্রিয় থাকার পেছনে প্রতি মাসে তাঁর পকেট থেকে বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়। কিন্তু বছরের শেষে যে বেতন মেলে, তা বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে কোনোভাবেই খাপ খায় না। মাস শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে পকেটে টান পড়ে তাঁর। ইনক্রিমেন্টের খাতা ইতিবাচক দেখালেও কেনাকাটার বাজারে গিয়ে কর্মী প্রতিদিন এই আয়ের ঘাটতি টের পাচ্ছেন।

ওয়াসিউর রহমানের এই সংকট শুধু একা তাঁর নয়। কাজের ক্ষেত্র ও পদ আলাদা হলেও নিত্যপণ্যের চড়া দাম এবং চাকরির নিজস্ব বাড়তি খরচ সামলাতে গিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন দেশের কোটি কোটি বেসরকারি চাকরিজীবী। বেসরকারি চাকরিজীবীদের এই আর্থিক টানাপোড়েনের প্রধান কারণ অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি। কয়েক বছর ধরে সাধারণ মানুষের আয় যে গতিতে বেড়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে তার চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতি থেকে শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশীয় পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছে। সহজ কথায়, উপার্জনের তুলনায় নিত্যদিনের খরচের বাড়বাড়ন্ত সাধারণ মানুষকে চাপে ফেলছে। এদিকে বিসিএসে ‘রিপিট ক্যাডার’ বন্ধে যে উদ্যোগ পিএসসির, ৫০তম থেকেই মিলতে পারে সুফল।

ম্যানেজার ওয়াসিউর রহমানের মতো মাঠপর্যায়ে কাজ করা কর্মীরা এই চাপে বেশি দিশাহারা। উত্তরায় একটি বায়িং হাউসে জুনিয়র কর্মী হিসেবে কাজ করেন সোহেল রানা। প্রতিদিন রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে বিভিন্ন গার্মেন্টসে ঘুরতে হয় তাঁকে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় টানা যাতায়াত এবং দুপুরে বাইরে খাওয়ার পেছনেই তাঁর বেতনের একটি বড় অংশ চলে যায়। প্রতিষ্ঠান থেকে যাতায়াতের যে ভাতা দেওয়া হয়, তা প্রকৃত খরচের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে বাড়তি টাকা পকেট থেকেই দিতে হয়।

আর্থিক বৈষম্যের পাঁচ বছরের চিত্র

বিগত পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে বেসরকারি খাতের এই সংকট স্পষ্ট হয়। বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১–২২ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ১৫ শতাংশ, যা ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশে। এই ধারাবাহিক হারগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে দেশে সাধারণ জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে আনুমানিক ৫২ শতাংশ। সহজ হিসেবে, পাঁচ বছর আগে যে পণ্য ও সেবার পেছনে ২০ হাজার টাকা খরচ হতো, এখন একই মান ধরে রাখতে লাগছে ৩০ হাজার ৪০০ টাকা। অর্থাৎ কেবল পাঁচ বছরের ব্যবধানে একজন কর্মীর সংসারের গড় খরচ বেড়েছে অন্তত ১০ হাজার ৪০০ টাকা।

আয়ের সীমাবদ্ধতা ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ

একজন বেসরকারি কর্মী যদি পাঁচ বছর আগে ২০ হাজার টাকা বেতনে কাজ শুরু করে বছরে গড়ে দেড় হাজার টাকা ইনক্রিমেন্ট পান, তবে পাঁচ বছর পর তাঁর বর্তমান মূল বেতন দাঁড়ায় ২৭ হাজার ৫০০ টাকা। তিনি প্রতিবছর গড়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা (প্রতিষ্ঠানভেদে কমবেশি হতে পারে) করে ইনক্রিমেন্ট পেয়েছেন।

কিন্তু ৫২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির ব্যবধানে সংসার চালাতে প্রয়োজন ৩০ হাজার ৪০০ টাকা।

অর্থাৎ ইনক্রিমেন্ট পাওয়ার পরও ওই কর্মীর প্রতি মাসে বাস্তব ঘাটতি থেকে যাচ্ছে অন্তত ২ হাজার ৯০০ টাকা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিরপুরের এক মানবসম্পদ কর্মকর্তা জানান, করপোরেট পরিবেশ ও পোশাকের মান বজায় রাখা এবং সন্তান ও মা-বাবার চিকিৎসা খরচ মেটাতে গিয়ে মাস শেষে কোনো সঞ্চয় থাকছে না। বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি থমকে গেছে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে মাত্র ১০ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান থাকায় অতিরিক্ত শ্রমিকের জোগানের সুযোগ নিয়ে মালিকপক্ষ নামমাত্র বেতন বাড়ায়। ২০২২–২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে তা ছিল ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ এবং ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশে। বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে যে, চড়া মূল্যস্ফীতি সাধারণ পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে এবং একই সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ন্যূনতম মজুরি, বাধ্যতামূলক বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট প্রবিধান ও শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুবিধা দিতে হবে। পর্যাপ্ত দেশি–বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বাড়াতে পারলেই কেবল চাকরিজীবীদের দর–কষাকষির শক্তি তৈরি হবে।

অর্থনৈতিক সংকট ও উত্তরণের পথ

  • কানাডায় পিএইচডি শিক্ষার্থীদের জন্য ৮ হাজার ২০০ কোটি টাকার বৃত্তি, পাবেন ৫০ জন।
  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহতাব উদ্দিনের মতে, মূল্যস্ফীতি সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীনভাবে সুদের হার ও রেপো বাড়িয়ে কঠোর মুদ্রানীতি চালাতে হবে।
  • সরকারের উচিত দেশে উৎপাদন হয় না এমন আমদানিকৃত ফলের মতো খাদ্যপণ্যের শুল্ক ১০০ শতাংশ থেকে ৫–১০ শতাংশে নামানো।
  • মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর মাধ্যমে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল করা জরুরি।

অর্থনৈতিক এই সংকট কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং কাঠামোগত। বেসরকারি খাতে নির্দিষ্ট কোনো কেন্দ্রীয় বেতনকাঠামো না থাকায় কোম্পানিভেদে বেতনের তফাত বিশাল। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের সময় অন্যান্য দেশ কঠোর মুদ্রানীতি নিলেও বাংলাদেশে টাকা ছাপিয়ে ব্যাংক বাঁচানো এবং ক্রমাগত বাজেটের আকার বড় রাখার বিষয়টিও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসে ভূমিকা রেখেছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, সংকটের ব্যাপ্তি এখন আর নির্দিষ্ট কোনো পদে সীমাবদ্ধ নেই।

শেয়ার করুন