সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন এবং নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন নিয়ে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে আয়োজিত সাড়ে ছয় ঘণ্টার এই দীর্ঘ বৈঠকে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া ও এর রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন আমন্ত্রিত সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপকরা। আরও প্রস্তাব পাওয়ার পর বিষয়গুলো কমিটিতে উপস্থাপন করা হবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, সংসদের উচ্চকক্ষের সদস্যসংখ্যা ১০৫ নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ৫০ জন সংসদীয় আসনের অনুপাতে এবং ৫০ জন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে নির্বাচিত হবেন। বাকি পাঁচজন সদস্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত হবেন। এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তৈরি হবে বলে বৈঠকে মত দেওয়া হয়। বাকি পাঁচজনকে মনোনয়ন দেবেন রাষ্ট্রপতি। তার মতে, এতে সরকারের মেয়াদ শেষ হলেও অন্তত একটি নির্বাচিত সংসদ সব সময় বহাল থাকবে। অন্যদিকে, প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া এক শিক্ষাবিদ উচ্চকক্ষের স্পিকারের নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। বৈঠকে অংশ নেওয়া একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষাবিদও প্রস্তাবটিকে গ্রহণযোগ্য উল্লেখ করেন।
তার পরিকল্পনা অনুযায়ী, সংবিধানে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে, যেখানে উচ্চকক্ষের স্পিকার পদাধিকারবলে এই দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া সরকার ও বিরোধী দলের সম্মতিতে উচ্চকক্ষ থেকে উপদেষ্টাদের নিয়োগের বিধান রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে সংসদের নিম্নকক্ষের মেয়াদ চার বছর এবং উচ্চকক্ষের মেয়াদ ছয় বছর করার প্রস্তাব এসেছে, যাতে রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির কাঠামো ও কর্মপরিধি নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, উচ্চকক্ষের স্পিকারের নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের বিষয়টি বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। তবে কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এখনো আসেনি। কমিটির আরও এক বা দুটি বৈঠক বাকি রয়েছে এবং সেসব বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনার পর প্রতিবেদনের চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হবে। এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোর মধ্যে শনিবারের আলোচনা সবচেয়ে ফলপ্রসূ ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শনিবারের এ বৈঠকে অংশ নেওয়া ৪৪ জন সদস্য সংবিধানের মৌলিক কাঠামোসহ প্রশাসনিক ও বিচারিক সংস্কার নিয়ে মতামত দেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, বিচারক নিয়োগের জন্য পৃথক আইন প্রণয়ন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং বিচারকদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ১১৬ অনুচ্ছেদের প্রয়োজনীয় সংশোধন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারের বিষয়েও সদস্যদের মধ্যে মোটামুটি ঐকমত্য হয়েছে। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থবিল, আস্থা ভোট ও সংবিধান সংশোধন ছাড়া অন্যান্য সাধারণ বিষয়ে সংসদ সদস্যরা যেন স্বাধীনভাবে মতামত বা ভোট দিতে পারেন, সেই সুযোগ রাখা হবে।
বৈঠকে বিভিন্ন দেশের বিচার ব্যবস্থার উদাহরণ তুলে ধরে আইনের শাসন ও বিচারিক পর্যালোচনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান মাথায় রেখে কমিটি কাজ করছে বলে জানা গেছে। আলোচনা চলমান রয়েছে এবং প্রস্তাবগুলো সংকলনের কাজ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন কমিটির সভাপতি। বৈঠকে উপস্থিত সদস্যদের সূত্রে জানা গেছে, তার প্রস্তাবে অনেকে সমর্থন জানান। কমিটির পক্ষ থেকে ৬০ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ৪৪ জন।





