৪ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ক্যানসারের দ্বিতীয় লড়াইয়ে সামিয়া

প্রকাশ:

ছেলের হাতে ন্যাড়া হলো মায়ের মাথা, একটু পরেই ছেলেও নিজের মাথা ন্যাড়া করে হাজির হলেন। স্ত্রীর এই দুঃসময়ে এবং চরম কষ্টের মুহূর্তে তাঁকে মোটেও একা থাকতে দিতে চাননি স্বামীও, তাই তিনিও নিজের মাথার চুল ফেলে দিয়ে স্ত্রীর পাশে এসে দাঁড়ালেন। ক্যানসারের চিকিৎসায় চুল হারানোর যন্ত্রণা যেন সামিয়া আফরিনকে একা বইতে না হয়, সে জন্যই পরিবারের মানুষগুলো ভাগ করে নিলেন সেই কষ্টের অনুভূতি। ক্যানসারের চিকিৎসার প্রভাবে চুল একসময় পড়ে যাবে, এ কথা চিকিৎসকেরা আগেই সামিয়াকে জানিয়েছিলেন। তাই তিনি আগে থেকেই মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন। প্রথমে নিজের চুল ছোট করেন এবং পরবর্তী সময়ে বড় ছেলে আহানাফ আরাবির হাতে মাথা ন্যাড়া করান। কেমোথেরাপির কারণে চুল পড়ে যাওয়ার এই বাস্তবতাকে সামিয়া মন খারাপ না করে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। গত ১৫ সেপ্টেম্বর মাথা ন্যাড়া করার একটি বিশেষ ভিডিও ফেসবুকে পোস্ট করে নিজের ভেতরের অনুভূতি প্রকাশ করেছিলেন তিনি। তবে কাউকে এই যন্ত্রণা বলে বোঝানো যাবে না। তবে নিজের পোস্টের মন্তব্যে এমন ঘটনা খুব কমই দেখেছেন বলে জানান সামিয়া। সামিয়া বলেন, ‘আমি অসুস্থ, এটা মানসিকভাবে কখনোই ভাবতে চাই না। সামিয়া আগে থেকেই ‘পারপাস বাই সামিয়া’ নামে একটি পডকাস্ট করছেন।

একবার ক্যানসার জয়ের পর আবার নতুন লড়াইয়ের মুখোমুখি

জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক সামিয়া আফরিন এখন ক্যানসারের দ্বিতীয় ধাপে চিকিৎসাধীন এবং এক কঠিন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। গত ১১ অক্টোবর রাজধানীর বনানীতে নিজের বাসায় বসে মুখোমুখি হন সংবাদমাধ্যমের। সামিয়া জানান, চুল মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য হতে পারে, তবে চুল থাকুক বা না থাকুক, আত্মবিশ্বাসটাই আসল বিষয়। সৃষ্টিকর্তা তাঁকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছেন এবং তিনি নিজের পায়ে হেঁটে চলাফেরা করতে পারছেন, এটিই তাঁর কাছে অনেক বড় প্রাপ্তি। ২০২২ সালে প্রথমবার সামিয়ার কোলন ক্যানসার ধরা পড়েছিল। তখন চিকিৎসকের পরামর্শে ওই বছরের এপ্রিলে সিঙ্গাপুরে যান তিনি। সেখানে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, তাঁর ক্যানসার ইতিমধ্যেই চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এই খবর শুনে তিনি এতটাই হতভম্ব ও ভেঙে পড়েছিলেন যে, এমনকি কোনো চিকিৎসা না করেই দেশে ফিরে আসার কথাও একপর্যায়ে ভেবেছিলেন। তবে সামিয়ার চিকিৎসক দেবর যখন প্রথম ক্যানসারের খবরটি দেন, তখন সামিয়া নিজেকে বুঝিয়েছিলেন—যা হওয়ার তা হয়েই গেছে, সবকিছু নিয়ে মন খারাপ করে লাভ নেই; সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারাটাই আসল। হাঁটাচলা করতে পারছি, এটাই অনেক বড় পাওয়া। সন্ধ্যায় সেজেগুজে দাওয়াত খেতেও গিয়েছি।

চিকিৎসার তীব্র যন্ত্রণা ও শারীরিক জটিলতা

পরবর্তী সময়ে সিঙ্গাপুরের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সামিয়াকে ইমিউনোথেরাপি নেওয়ার পরামর্শ দেন।

অত্যন্ত ব্যয়বহুল এই চিকিৎসা নিতে সম্মত হন তিনি এবং নতুন করে শুরু হয় ক্যানসারের বিরুদ্ধে তাঁর জীবনসংগ্রাম। যিনি এর মধ্য দিয়ে যাবেন, তিনিই বুঝবেন।’।

২১ দিন পরপর দেওয়া এই থেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত তীব্র ও যন্ত্রণাদায়ক।

প্রথম থেরাপি নেওয়ার পর তিনি সঠিকভাবে ঢোক পর্যন্ত গিলতে পারতেন না এবং পুরো শরীরে তীব্র চুলকানি হতো।

২০১৩ সাল এবং পরবর্তীতে ২০২৩ সালে সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফেরার পরও তাঁকে দীর্ঘ দিন নানা ধরনের শারীরিক জটিলতায় ভুগতে হয়েছে। যন্ত্রণার তীব্রতা বোঝাতে গিয়ে সামিয়া বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসবের সময় যে যন্ত্রণা হয়, অনেকটা সে রকম যন্ত্রণা হতো। এই অসহ্য শারীরিক কষ্ট সত্ত্বেও তিনি চিকিৎসা থামাননি। শুরুতে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার সময় স্বামী ও ননদসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা তাঁর সঙ্গে যেতেন, কিন্তু পরে মানসিক জোর বাড়িয়ে একা একাই যাতায়াত শুরু করেন সামিয়া। পরবর্তীতে চলতি বছরের গত ২২ জুলাই সিঙ্গাপুরে আবার তাঁর একটি বড় অস্ত্রোপচার করা হয়। এবারের চিকিৎসার অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে তিনি জানান, তিনি খাবারের কোনো স্বাদ বা গন্ধ কিছুই পাচ্ছেন না। তা ছাড়া জেনেটিক পরীক্ষায় তাঁর শরীরে কিছু জিনগত ত্রুটিও ধরা পড়েছে, যার ফলে ভবিষ্যতে শরীরের অন্য কোথাও ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়ে গেছে। তবুও আশা না হারিয়ে তিনি বিশ্বাস করেন, ক্যানসার আর ফিরবে না। এ সময় পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য ও মানসিক সমর্থন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। তাদের সঙ্গে সময় কাটে দিনের একটা বড় অংশ।

পরিবারের ভালোবাসা ও যৌথ মানসিক শক্তি

বর্তমানে স্বামী, দুই ছেলে এবং বাবা-মাকে নিয়ে বনানীর বাড়িতে থাকেন সামিয়া। তাঁর বাবা আবদুর রহিম একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী এবং মা জীবন নাহার গৃহিণী। ২৭ বছরের দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে স্বামী রেজাউল ইমরানকে প্রতিটি কঠিন সংকটে সবসময় পাশে পেয়েছেন সামিয়া। একই সঙ্গে নিজের বাবা-মা ও শ্বশুরবাড়ির স্বজনদের কাছ থেকেও শুরু থেকেই পূর্ণ সমর্থন পেয়ে আসছেন। পরিবারের কারও ক্যানসার হলে তার প্রভাব যে পুরো সংসারে পড়ে, তা ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারেন তাঁর বড় ছেলে আহানাফ আরাবি। আহানাফ বর্তমানে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়ছেন। মায়ের প্রথমবার ক্যানসার ধরা পড়ার সময় তিনি কানাডায় পড়াশোনা করছিলেন, কিন্তু মায়ের পাশে থাকার জন্য পড়াশোনা ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন এবং নতুন করে ভর্তি হন। নিজের ও মায়ের চুল কেটে ফেলা নিয়ে আহানাফ বলেন, ‘মাকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্যই চুল কেটে দিই। নিজের চুলও কেটে ফেলি, ভালোই লেগেছে। ক্যাম্পাসে গেলে বন্ধুরা চুল ফেলে দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে মায়ের কথা বলি এবং সবাই এতে সাপোর্ট করেছে।’ এ ছাড়া সামিয়া নিজের ভাইয়ের ছেলে আয়মান আওসাফের আইনি অভিভাবকত্ব নিয়েছেন, সে এখন ও লেভেলে পড়াশোনা করছে। এর আগে কাছের মানুষ ছাড়া অনেকেই তাঁর অসুস্থতার কথা জানতেন না। ফেসবুক পোস্টে অনেকেই বাজে বা নেতিবাচক মন্তব্য করেন। এখন প্রায় প্রতিটি ঘরেই ক্যানসার ঢুকে যাচ্ছে।’।

মানসিকভাবে শক্ত থাকার বার্তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

সামিয়া মনে করেন, ক্যানসারের মতো কঠিন রোগে শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিক চাপ সামলানো অত্যন্ত জরুরি। ক্যানসার আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় হতাশ হয়ে পড়েন বা অল্পতেই রেগে যান। কিন্তু সামিয়া নিজের কষ্টের কথা আড়াল করে অন্যদের শক্ত থাকার বার্তা দিতে চান। গত বছরের ২০ মার্চ ঢাকার বনানীতে ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের সহায়তায় আয়োজিত ‘রিভোগ ওয়্যার টু কেয়ার’ নামের পোশাক প্রদর্শনীতে তিনি প্রথম নিজের রোগের কথা প্রকাশ্যে আনেন। এর পর থেকে তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত ক্যানসার নিয়ে লিখছেন, যাতে অন্য রোগীরা সাহস পান। তিনি মনে করেন, তাঁর পোস্ট পড়ে কেউ মানসিক শক্তি পেলে সেটাই বড় সাফল্য। বর্তমানে চিকিৎসার বাইরে নতুন কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে চান না সামিয়া; কেমোথেরাপির পর্ব শেষ না হওয়া পর্যন্ত উপস্থাপনায় ফিরছেন না। অবসর সময়ে তিনি গান শুনছেন, বারান্দার গাছে পানি দিচ্ছেন এবং পোষা দুটি বিড়ালকে সময় দিচ্ছেন। নিয়মিত ব্যায়াম করা ও খাদ্যাভ্যাস ঠিক রাখার বিষয়ে বরাবরই সচেতন ছিলেন সামিয়া। উজ্জ্বলা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবেও ক্যানসার রোগীদের জন্য মেডিক্যাল ক্যাম্প আয়োজন ও তহবিল সংগ্রহের কাজ করছেন তিনি। সামিয়া গান শুনতে ও নিজেও গাইতে ভালোবাসেন। বারান্দার গাছপালা, গান আর দুই বিড়ালকে ঘিরে সাজিয়ে নিচ্ছেন দিনগুলো।

বাবার চোখের জল ও চিকিৎসা যাত্রার বর্তমান আপডেট

মেয়ের অসুস্থতা ও ক্যানসারের চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অশ্রুসজল হয়ে পড়েন সামিয়ার বাবা আবদুর রহিম। তিনি জানান, ক্যানসারের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং মেয়ের শারীরিক কষ্ট দেখে নিজেদের ভেতরের কষ্ট নিজেদের মধ্যেই চেপে রাখেন তাঁরা। তিনি সবার কাছে সামিয়ার জন্য দোয়া চেয়েছেন। সামিয়া জানান, বাবার কাছ থেকেই তিনি মানসিকভাবে শক্ত থাকার শিক্ষা পেয়েছেন, কিন্তু সেই বাবাকেও মেয়ের কষ্টে চোখে জল ধরে রাখতে দেখা যায়নি। ক্যানসারে ইতিমধ্যে নিজের চাচা ও ফুফুসহ একাধিক স্বজনকে হারিয়েছেন সামিয়া। তাই পরিবারের সামনে নিজেকে সবসময় হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করেন। নিজেকে একটু ভিন্ন অভিজ্ঞতা দিতে সম্প্রতি একা একাই থাইল্যান্ড ভ্রমণে গেছেন তিনি। সেখান থেকে হোয়াটসঅ্যাপে জানান, ১৩ অক্টোবর তিনি থাইল্যান্ড পৌঁছেছেন এবং ২৩ অক্টোবর দেশে ফিরবেন। দেশে ফেরার পর আগামী ২৫ অক্টোবর তাঁকে পরবর্তী কেমোথেরাপি নিতে হবে।

শেয়ার করুন