১৯৫৫ সালের ১৭ অক্টোবর পুনেতে জন্ম নেওয়া স্মিতা পাতিল ভারতীয় সিনেমার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। রাজনীতিবিদ বাবা শিবাজিরাও গিরধর পাতিল ও সমাজসেবী মা বিদ্যাতাই পাতিলের কন্যা স্মিতা পুনে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী ছিলেন। ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি মুম্বাই দূরদর্শনের সংবাদপাঠিকা হিসেবে কাজ করতেন। শ্যাম বেনেগালের হাত ধরে সিনেমায় আসা এই অভিনেত্রী প্রথাগত ফর্সা নায়িকার ধারণা ভেঙে দিয়ে নিজের স্বতন্ত্র জায়গা করে নিয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে ‘মেরে সাথ চল’ ছবির মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে। পরবর্তীতে ‘নিশান্ত’, ‘মন্থন’, ‘ভূমিকা’, ‘আক্রোশ’, ‘অর্থ’ ও ‘অর্ধসত্য’-এর মতো অসাধারণ সব ছবিতে অভিনয় করে তিনি নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখেন। নায়িকা হতে হলেই গায়ের রং হবে ফর্সা—এমন ধারণাকে ভেঙে দিয়েছিলেন স্মিতা। তাঁর অভিনীত ছবিগুলো ছিল প্রথাগত নায়কপ্রধান ছবির বিপরীত মেরুর। তাঁর প্রথম ছবি ‘মেরে সাথ চল’ মুক্তি পায় ১৯৭৪ সালে। স্মিতার নামের পাশে একে একে যোগ হয় ‘আক্রোশ’, ‘চক্র’, ‘সদগতি’, ‘অর্থ’, ‘দেবশিশু’, ‘চিদম্বরম’, ‘গুলামি’, ‘বাজার’, ‘আকালের সন্ধানে’, ‘মান্ডি’, ‘অর্ধসত্য’, ‘মির্চ মাশালার’ মতো মাইলফলক ছবি। ক্যারিয়ারের শুরুতেই তিনি বুঝেছিলেন, নিজের পথ বেছে নিতে হবে।
বাণিজ্যিক সিনেমায় কাজ করার ক্ষেত্রে স্মিতা ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক। তিনি ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই স্পষ্ট করেছিলেন যে, কেবল ভালো চিত্রনাট্য ও শক্তিশালী পরিচালকের সঙ্গেই কাজ করবেন, যাতে বাণিজ্যিক চাপের মুখে নিজের স্বকীয়তা হারিয়ে না ফেলেন। তবে বাণিজ্যিক ছবির অভিজ্ঞতা সব সময় সুখকর ছিল না। অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে ‘নমক হালাল’ ছবির বৃষ্টির গানে অভিনয়ের সময় তিনি তীব্র অস্বস্তিতে ভুগেছিলেন। অমিতাভ পরবর্তী সময়ে স্মৃতিচারণা করে জানিয়েছিলেন, স্মিতা মনে করতেন ওই গানের দৃশ্যটি তাঁর সংস্কৃতি ও ব্যক্তিত্বের পরিপন্থী। এমনকি ছবিটি মুক্তির পর এয়ারপোর্টে কেউ যখন তাঁকে এই সিনেমার সূত্র ধরে চিনতে চাইত, তখন তিনি লজ্জা অনুভব করতেন। দুজনের ব্যক্তিত্বের প্রভাব পড়েছিল স্মিতার বেড়ে ওঠায় ও মানসিকতায়। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রভাব পূর্ণমাত্রায় পড়ত অভিনয়েও। সেই অধ্যায় দীর্ঘ হয় অন্যান্য যশস্বী পরিচালকের নির্দেশনায়। ইন্ডিয়া টুডেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্মিতা বলেছিলেন, ‘আমি ভাবতাম, একটি বাণিজ্যিক ছবি করলে মজা হবে। আমি ভাবছি, শাবানা (আজমি) পারবে কি না ওই বৃত্ত থেকে বের হতে—আমার মনে হয়, সে এখন অনেক ভেতরে ঢুকে গেছে। ‘নমক হালাল’–এর অস্বস্তিকর দৃশ্য অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও স্মিতার জন্য সহজ ছিল না। ‘নমক হালালে’ তিনি ছিলেন নায়কের প্রেমিকা—একেবারে তথাকথিত ‘নায়িকা’র চরিত্রে। ২০১৫ সালে স্মিতা পাতিলকে নিয়ে একটি বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে অমিতাভ স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘ও বলেছিল, এই গানটা তার সংস্কৃতি ও চিন্তার বাইরে। একবার এয়ারপোর্টে কেউ ওকে “নমক হালালের” জন্য চিনে ফেললে সে নাকি লজ্জা পেত।
পেশাদার জীবনে স্মিতা যেমন আপসহীন ছিলেন, ব্যক্তিগত জীবনেও ছিলেন তেমনই স্পষ্টবাদী। রাজ বব্বরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ইন্ডাস্ট্রিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। অভিনয়শৈলীর মতো ব্যক্তিগত সংলাপেও তিনি ছিলেন নির্ভীক। এক সিনেমার দৃশ্যে ‘ম্যায় তোমহারে বাচ্চে কি মা বাননে ওয়ালি হুঁ’—এই সংলাপটি বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন তিনি। তাঁর মতে, এটি ছিল ক্লিশে ও আপত্তিকর। অনেক আলোচনার পর চিত্রনাট্য পরিবর্তন করে সেটিকে ‘ম্যায় মা বাননে ওয়ালি হুঁ’ করা হয়েছিল। পরিচালক শ্যাম বেনেগাল তাঁর সম্পর্কে বলতে গিয়ে জানিয়েছিলেন, স্মিতা ছিলেন বহুমাত্রিক এক অভিনেত্রী, যিনি যেকোনো চরিত্রের গভীরে খুব সহজে ঢুকে যেতে পারতেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বরাবর সরব হয়েছেন নারীদের সমস্যা ও অধিকার নিয়ে। কিন্তু ভালো পরিচালক পাওয়া কঠিন, তাঁরা প্রায়ই নতুন মুখকে প্রাধান্য দেন। কারণ, তাকে যা করতে বলা হচ্ছিল, সে তা বুঝে উঠতে পারছিল না।’।
স্মিতার ব্যক্তিগত জীবনের একটি তিক্ত অভিজ্ঞতা ছিল যশ চোপড়ার সঙ্গে। শাহরুখ খানের সঙ্গে কথোপকথনের সময় যশ চোপড়া স্বীকার করেছিলেন, তিনি স্মিতাকে একটি প্রকল্প থেকে শুটিংয়ের ঠিক এক দিন আগে বাদ দিয়েছিলেন। নিজে না জানিয়ে বিষয়টি শশী কাপুরকে দিয়ে জানানোয় স্মিতা কষ্ট পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে তাঁদের দেখা হলে স্মিতা সরাসরি বলেছিলেন যে, সিদ্ধান্তটি তাঁর জন্য কষ্টের ছিল না, কিন্তু শশীর মাধ্যমে বার্তাটি আসায় তিনি আঘাত পেয়েছিলেন। যশ চোপড়া তখন নিজের ভুল স্বীকার করে লজ্জিত হয়েছিলেন। কিন্তু হিন্দি ছবিতে একটাতেই থামা যায় না। পরিবর্তে খবরটি পৌঁছে দিতে পাঠিয়েছিলেন শশী কাপুরকে। পরে মুখোমুখি হলে স্মিতা বলেন, ‘যশজি, আপনি যা করেছেন, নিশ্চয়ই ভেবেচিন্তেই করেছেন।
স্মিতার জীবনের শেষ দিনগুলো ছিল অত্যন্ত বেদনার। ১৯৮৬ সালের ২৮ নভেম্বর রাজ-স্মিতার একমাত্র সন্তান প্রতীকের জন্ম হয়। সন্তান জন্মের পর থেকেই শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে তাঁর। মাত্র দুই সপ্তাহ বয়সী শিশুকে রেখে ১৯৮৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর মাত্র ৩১ বছর বয়সে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। জ্বর ও অসুস্থতার কারণে শেষ সময়ে তিনি শিশুকে কোলে নেওয়ার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছিলেন। হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি কোমায় চলে যান এবং শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
অভিনয়ের পাশাপাশি ফটোগ্রাফি, গাড়ি চালানো ও ভলিবলের প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। নারীর শক্তিকে রূপালি পর্দায় তুলে ধরতে তিনি সবসময় ছিলেন সচেষ্ট। তিনি মনে করতেন, সিনেমায় নারীদের কেবল ভুক্তভোগী হিসেবে না দেখিয়ে তাঁদের ভেতরের শক্তিকে ফুটিয়ে তোলা প্রয়োজন। আজন্ম লড়াকু এই অভিনেত্রী কেবল সমান্তরাল ধারার সিনেমার বিপ্লবই ঘটাননি, বরং একজন নারীর ‘না’ বলার সাহসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন। এই সম্পর্কের জন্য প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী হয়ে উঠেছিলেন ইন্ডাস্ট্রির মুখরোচক আলোচনা।





