১৪ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গণমাধ্যমকে টার্গেট করে আইন করা হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রকাশ:

প্রস্তাবিত ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট সম্পাদক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা। সচিবালয়ে আয়োজিত দ্বিতীয় পরামর্শ সভায় বক্তারা আইনটির বিভিন্ন ধারা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে বলেন, প্রয়োজনীয় সংশোধনী ছাড়া এই আইন পাস হলে বাংলাদেশ বড় ধরনের কারাগারে পরিণত হতে পারে। গণমাধ্যমের ওপর অপপ্রয়োগের আশঙ্কা ব্যক্ত করে তারা আইনটিতে সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান।

সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, সরকার মিডিয়াকে লক্ষ্য করে এই আইন প্রণয়ন করছে না। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন আইন চাই না যা কোনো সাংবাদিককে হয়রানি করবে। কোনো সাংবাদিক যেন এই আইনের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে আমরা সচেষ্ট। সবার মতামতের ভিত্তিতে আইনটিকে সমৃদ্ধ করা হবে।’ মন্ত্রী জানান, সাইবার স্পেসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই আইনের মূল লক্ষ্য, কাউকে নিপীড়ন করা নয়। আমরা মনে করি, সবার আলাপ-আলোচনার মধ্যদিয়ে আইনটা সমৃদ্ধ হবে। সভা শেষে ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টে সংশোধনী আনার জন্য একটা খসড়া বিল আমরা রেডি করেছিলাম। যারা সাইবার স্পেসে কাজ করেন, আইটি এক্সপার্ট তাদের সঙ্গে আমরা কথা বলি।

এই আইনের অন্যতম বিতর্কিত দিক হলো এতে মোবাইল কোর্টের বিধান রাখা। সভায় উপস্থিত সম্পাদক ও সাংবাদিক নেতারা এর তীব্র বিরোধিতা করেন। প্রধান সম্পাদক ও নোয়াব সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘এ ধরনের আইন যদি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়, তবে তা একটি জঘন্য কালো আইনে পরিণত হবে। এটি কি আমাদের সুরক্ষা দেবে, নাকি ভিকটিম করবে—তা বড় প্রশ্ন।’ খসড়া আইনে মোবাইল কোর্টের বিধান রাখারও বিরোধিতা পৃষ্ঠা ৮ কলাম ১ করেছেন সম্পাদক ও সাংবাদিক নেতারা।

দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম এই খসড়াকে গণতান্ত্রিক সরকারের মূল্যবোধের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, সরকার যেন নিজের পায়ে কুড়াল মারার মতো এমন আইন না করে। মাহফুজ আনাম সাংবাদিক ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন, যা পরে গৃহীত হয়। এই কমিটির মাধ্যমে খসড়া আইনে মৌলিক পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।

কমিটি গঠনের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রস্তাবিত খসড়াটি পর্যালোচনার জন্য সাংবাদিক, সম্পাদক ও আইটি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি কাজ করবে। কমিটি আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে বিস্তারিত সুপারিশ পেশ করবে। প্রধান তথ্য অফিসার সৈয়দ আবদাল আহমদ এই পর্যালোচনার ফোকাল কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সুপারিশ পাওয়ার পর খসড়াটি আবারো সর্বসাধারণের মতামতের জন্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। এর আগে বিষয়টি নিয়ে সরকারের অবস্থান সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম ছাড়াও অ্যাটকো মহাসচিব ও একুশে টেলিভিশনের চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ বক্তব্য রাখেন। এছাড়া ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, সচিব মাহবুবা ফারজানা, প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, আমার দেশের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক জাহেদ চৌধুরীসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার প্রতিনিধিরা সভায় অংশ নেন।

উল্লেখ্য, এর আগে ওয়েবসাইট ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে আসা মতামতগুলো সরকার সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করেছে। সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, গণমাধ্যম বা অনলাইন সাংবাদিকরা যাতে অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, তা নিশ্চিত করতে যথাযথ আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা হবে। সভায় সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রয়োজনীয়তাকে নীতিগত সমর্থন দিলেও একে গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণকারী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অপপ্রয়াস ঠেকাতে কঠোর হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। অনেক মানবাধিকার সংগঠন মতামত দিয়েছে।

শেয়ার করুন