১১ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাজীপুরের ধাঁধার চরে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের আবেদন, স্থানীয়দের উদ্বেগ

প্রকাশ:

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ধাঁধার চরের ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর খাসজমি দীর্ঘমেয়াদী বন্দোবস্ত চেয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছে সাননোভা এনার্জি ওপিসি নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক কামাল জামান মোল্লা, যিনি মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সাবেক সদস্য এবং গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাদারীপুর-১ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ছিলেন। গত ১৬ আগস্ট তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে এই আবেদনটি জমা দেন। প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। আবেদনে অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালার আওতায় বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর জমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত চাওয়া হয়।

প্রকল্পটির পক্ষে আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই উদ্যোগে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বিদেশি বিনিয়োগ নিশ্চিত হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও তাদের আলোচনা চলছে। কামাল জামান মোল্লার দাবি, তিনি কৃষিজমি বা নদীর জমি ইজারা চেয়ে আবেদন করেননি, বরং যেসব খাসজমি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে, সেগুলোই প্রকল্পের জন্য চেয়েছেন। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেখানে একটি স্বয়ংক্রিয় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি রিসোর্ট টাইপের স্থাপনা নির্মাণেরও লক্ষ্য রয়েছে।

তবে এই প্রকল্প ঘিরে জমির শ্রেণি ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, ওই খাসজমির মধ্যে ৩০ দশমিক ৯৫ একর নদী, ১৩ দশমিক ৫৩ একর বালুচর, ৪৩ দশমিক ৬ একর সিকস্তি এবং ১৫২ দশমিক ৪৪ একর নাল শ্রেণির জমি রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্র নদের মিলনস্থলে অবস্থিত এই চরে বর্তমানে কৃষকরা চাষাবাদ করেন। চরে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ, সরীসৃপ ও ২৫-৩০ প্রজাতির পাখির বিচরণ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. সামছুল আলমের অভিযোগ, ইতিমধ্যেই চরের কিছু পুরোনো গাছ কেটে ফেলা হয়েছে, যা প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্য ক্ষতিকর। অর্থাৎ মোট জমির প্রায় ৬৩ শতাংশই নাল শ্রেণির। নদীর বুকের মধ্যে সবুজে ঘেরা এই চরে রয়েছে কৃষিজমি, গাছপালা, ঝোপঝাড় ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি-প্রাণীর আবাস। এখানে স্থানীয় কৃষকেরাও কৃষিকাজ করেন। তবে এটি ঠিক কত বছরের পুরোনো, তা আমরা জানি না।

পরিবেশকর্মী ও বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মনির হোসেন এই প্রকল্পের বিরোধিতা করে বলেন, বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য চরটি ইজারা দিলে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি চরটিকে প্রকৃতি ও নদী পর্যবেক্ষণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরামর্শ দেন। স্থানীয় বাসিন্দা মো. আলমগীরের শঙ্কা, দীর্ঘমেয়াদী বড় কোনো প্রকল্প চালু হলে চরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও কৃষকদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বাধাগ্রস্ত হবে। একই সুর শোনা গেছে জনপ্রতিনিধিদের কণ্ঠেও। গত ১৯ এপ্রিল গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসনের সংসদ সদস্য মো. সালাহউদ্দিন আইয়ুবী জাতীয় সংসদে এই চরকে বিশেষ পর্যটন এলাকা হিসেবে ঘোষণা ও সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দা মো. আলমগীর বলেন, বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলে বিপুল পরিমাণ জমি দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রকল্পের আওতায় চলে যাবে।

বর্তমানে জমি ইজারা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে যাচাই-বাছাই চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কাপাসিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নাহিদুল হক জানান, আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একটি প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভুইয়া বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, জমির শ্রেণি, বন্দোবস্তের আইনগত সুযোগ এবং কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাবসহ সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই ইজারার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা নীতি অনুযায়ী জনগণের ব্যবহার্য নদী, খাল ও নালা বন্দোবস্তের আওতার বাইরে রাখার বাধ্যবাধকতা থাকায় প্রকল্পটি এখন আইনি পরীক্ষার মুখে পড়েছে। ফলে ধাঁধার চরের জমিগুলোর প্রকৃত শ্রেণি ও বন্দোবস্তযোগ্যতা যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

শেয়ার করুন