১১ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতিসংঘে লিগ্যাল অফিসারের দায়িত্ব ও জাইমা রহমানের নিয়োগ

প্রকাশ:

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির কার্যালয়ে ‘লিগ্যাল অফিসার’ বা আইন কর্মকর্তা হিসেবে সম্প্রতি নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। জাতিসংঘে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর এই গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগটি সম্পন্ন হয়। খলিলুর রহমান ১৯০টি সদস্য রাষ্ট্রের গোপন ভোটাভুটিতে ৯৯টি ভোট পেয়ে এক বছরের জন্য সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। গত ৯ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে তিনি শপথ গ্রহণ করেন। এর আগে ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯০টি সদস্য দেশের গোপন ভোটাভুটিতে ৯৯ ভোট পেয়ে তিনি এ গৌরবময় দায়িত্ব লাভ করেন। এ তালিকায় জাইমা রহমানসহ মোট ছয়জন বাংলাদেশি রয়েছেন।

জাতিসংঘের দাপ্তরিক তথ্যানুযায়ী, সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ে লিগ্যাল অফিসার কোনো কেন্দ্রীয় আইন বিভাগের কর্মকর্তা নন; বরং তিনি সভাপতির ব্যক্তিগত আইনি উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সাবেক কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদের মূল কাজ হলো সাধারণ পরিষদের কার্যক্রমে আইনি সহায়তা প্রদান করা। বিশেষ করে রেজুলেশন উত্থাপন, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’-এর ক্ষেত্রে সভাপতির রুলিং প্রদান এবং যেকোনো সংশোধনী আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করা। ফিলিস্তিন বা ইউক্রেন সংকটের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে সভাপতি যাতে নিরপেক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তা নিশ্চিত করাই এই দপ্তরের অন্যতম লক্ষ্য। এছাড়া জাতিসংঘ সনদের ধারা ও অতীতের নজির বিশ্লেষণ করে সভাপতির বক্তব্যের খসড়া তৈরিতেও লিগ্যাল অফিসার সহায়তা করেন। সাবেক কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ পরিষদে রেজুলেশন বা প্রস্তাব কীভাবে উত্থাপিত হবে, কোনো সদস্য রাষ্ট্র ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’ তুললে সভাপতি কী ধরনের রুলিং দেবেন কিংবা কোনো সংশোধনী আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য কি না—এসব বিষয়ে। এ ছাড়া কোনো প্রস্তাব জাতিসংঘের প্রচলিত বিধিবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না অথবা বাজেট সংক্রান্ত প্রস্তাবে সংশ্লিষ্ট কমিটির অনুমোদন দরকার কি না, তাও যাচাই করেন তিনি। অন্য পাঁচজন হলেন কূটনীতিক মো. আব্দুল আলিম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেন, মফিজুল ইসলাম, জাকির আহমেদ এবং মো. রফিকুল আলম মোল্লা। তিনি যুক্তরাজ্যের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে আইন ও রাজনীতি বিষয়ে যৌথভাবে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন।

৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতির দপ্তরে বর্তমানে ২৯টি দেশের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত ৪০ জনের একটি দল কাজ করছে, যারা ছয়টি ভিন্ন ভাষায় কাজ করতে সক্ষম। নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ জানান, সাধারণ পরিষদের সভাপতির নিজস্ব এখতিয়ার রয়েছে তার কার্যালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ করার। জাতিসংঘের নিজস্ব স্থায়ী পেশাদার কর্মীদের বাইরেও সভাপতি নিজস্ব আইনি টিম গঠন করতে পারেন। দাপ্তরিক ওয়েবসাইটে জাইমা রহমানকে একজন ব্যারিস্টার এবং আইন ও নীতি বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের ঐতিহ্যবাহী ‘দি অনারেবল সোসাইটি অব দ্য ইনার টেম্পল’ থেকে বার-অ্যাট-ল সনদ অর্জন করেছেন।

ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের এই দায়িত্ব প্রাপ্তিকে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বহুপাক্ষিক আইনের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জনের একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদের ভাষ্যমতে, এই পদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ও শিক্ষাগত যোগ্যতা ব্যারিস্টার জাইমার রয়েছে। সামগ্রিকভাবে, জাতিসংঘের আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক রীতির ভেতরে থেকে সভাপতির সামগ্রিক কার্যক্রম পরিচালনা নিশ্চিত করাই তার মূল দায়িত্বের অংশ। এই পদে কাজ করার মাধ্যমে তিনি বিশ্ব কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র থেকে আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতা নিরসনে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগ পাবেন, যা তার পেশাগত ক্যারিয়ারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক পদে তার অন্তর্ভুক্তির পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে পদটির দায়িত্ব, পরিধি ও নিয়োগের মানদণ্ড নিয়ে নানা বিশ্লেষণ ও আলোচনা চলছে। সাধারণত আন্তর্জাতিক আইনে অভিজ্ঞ বা বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের এই পদে নিয়োগের ঐতিহ্য রয়েছে।

শেয়ার করুন