মধ্যপ্রাচ্যে গত ছয় মাস ধরে চলা অস্থিরতা সাম্প্রতিক সময়ে এক নতুন ও উদ্বেগজনক মোড় নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনার পাশাপাশি ইয়েমেন সীমান্তে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সাথে সৌদি আরবের সরাসরি সংঘাত পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছে। ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলার জবাবে হুথিরা সৌদি ভূখণ্ডে নিয়মিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। লোহিত সাগরের উপকূলে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হুথিদের ক্রমবর্ধমান আধিপত্যের কারণে এই সংঘাত কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি এবং বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের জন্য সৌদি আরব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক শ্রমবাজার এবং রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৪০ লাখের বেশি বাংলাদেশী কর্মরত রয়েছেন। শুধু ২০২৫ সালেই কর্মসংস্থানের জন্য ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জন বাংলাদেশী সৌদি আরবে গেছেন, যা ওই বছরের মোট প্রবাসী কর্মীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। এ ছাড়া চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই দেশটিতে গেছেন ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৭৭ জন শ্রমিক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে ৪ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসেও দেশটি থেকে এসেছে ৫৮ কোটি ৭৩ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংকুচিত হবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বিদেশী শ্রমিকদের ওপর। কোভিড মহামারীর সময়ের মতো শিল্প ও সেবা খাতে শ্রমের চাহিদা কমে যেতে পারে, ফলে অনেক প্রবাসী বাংলাদেশী বেকার হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হতে পারেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের সবচেয়ে বড় উৎস সৌদি আরব হওয়ায় এমন পরিস্থিতির প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ব্যাপক নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি করবে।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে নাজরান, খামিস মুশাইত, জিজান এবং আবহায় সৌদি সিভিল ডিফেন্স জরুরি সতর্কতা জারি করেছে। সৌদি আরামকোর বিভিন্ন স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে হুথিরা ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। যদিও মক্কায় হামলার অভিযোগটি হুথিরা প্রত্যাখ্যান করেছে, তবুও সেখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মক্কায় অবস্থানরত বাংলাদেশী সাব্বির রহমান জানান, প্রথমবারের মতো মসজিদুল হারামে সাইরেন বাজার পর প্রবাসীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তায়েফ প্রদেশেও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে একজন ইয়েমেনি নাগরিক নিহতের ঘটনা স্থানীয়দের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রেও সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সহযোগী। বাংলাদেশের বার্ষিক ৬৫-৭০ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদার মধ্যে ১৪-১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসে সৌদি আরামকো থেকে। কিন্তু এই সংঘাতের জেরে পাইপলাইন ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং লোহিত সাগরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া, নিরাপত্তা ব্যয় বাড়লে সৌদি সরকার তাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে ব্যয় পুনর্বিন্যাস করতে পারে, যার ফলে প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সঙ্কুচিত হওয়ার ভয় রয়েছে।
সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ ও তেল পরিবহনের সীমাবদ্ধতার কারণে দেশটির অপরিশোধিত তেল উৎপাদন গত আগস্ট মাসে নেমে এসেছে প্রায় ৬২ লাখ ব্যারেলে, যা তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। কেজ বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক এবং ফ্রান্সভিত্তিক জিওপলিটিক্স স্ট্র্যাটেজি ল্যাবের প্রধান ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন মনে করেন, সংঘাত আরও বড় আকার ধারণ করার পথে। তিনি জানান, হুথিদের লক্ষ্যবস্তু আবহা, নাজরান ও জিজানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী কাজ করেন, যারা মূলত কৃষি, খামার ও ছোট ব্যবসায় নিয়োজিত।
সৌদি আরবে ইলেকট্রিক পণ্যের ব্যবসায়ী নুরুল আফসার জানান, মহামারীর ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় প্রবাসী ব্যবসায়ীরা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। নিরাপত্তা সতর্কতার কারণে কেনাবেচায় ভাটা পড়েছে। ব্যবসায়িক ঝুঁকি বাড়ায় অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলার কথাও ভাবছেন।
সরকার সম্প্রতি সৌদি আরবের সাথে বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছিল। জুলাই মাসে আসা একটি উচ্চ পর্যায়ের সৌদি প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে বৈঠকে বন্দরসহ বিভিন্ন খাতে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। এর মধ্যে রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ও বে টার্মিনাল প্রকল্পে ১৮ কোটি ডলারের বিনিয়োগের বিষয়টি আলোচিত ছিল। এছাড়া আগস্ট মাসে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সফরের আমন্ত্রণ জানান। তবে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে এই বড় বিনিয়োগ প্রকল্পগুলো অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, সৌদি আরব বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের মূল ভিত্তি হওয়ায় সেখানকার যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, লোহিত সাগরে সংঘাতের কারণে ইউরোপে পণ্য রপ্তানিতেও বিঘ্ন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও অর্থনীতিতে এক নতুন সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। চাকরির আরও তথ্য: সৌদি আরব থেকে বড় অংকের বিনিয়োগ আনার চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। চাকরির আরও তথ্য: যুদ্ধের কারণে সৌদি আরবের নির্মাণ, সেবা ও অন্যান্য শ্রমঘন খাতে প্রকল্পের গতি কমা, নতুন কর্মী নিয়োগ হ্রাস কিংবা বিদ্যমান কর্মীদের আয় ও কাজের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রেমিট্যান্স যেভাবে আসছিল, সেটি ব্যাহত হলে রিজার্ভ বাড়ার গতিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরদিন মক্কা, জেদ্দা ও তায়েফেও বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে নিরাপদ থাকতে বলা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অবশ্য হুথিরা মক্কাকে লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যদিও এখন পর্যন্ত দৈনন্দিন জীবন অনেকটা স্বাভাবিক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আমরা সবাই মনে করতাম, সংঘাত যতই হোক, মক্কা নগরীতে হামলার মতো কোনো ঘটনা ঘটবে না।





