৬ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অভাবের কষাঘাত পেরিয়ে অদম্য মেধাবীদের জিপিএ-৫ জয়ের গল্প

প্রকাশ:

জীবনযুদ্ধে হার না মানা কয়েকজন অদম্য মেধাবীর গল্প এটি। অভাব-অনটনের সংসার, স্বজন হারানোর বেদনা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ছিল যাদের নিত্যসঙ্গী, সেই শিক্ষার্থীরাই এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনের মাধ্যমে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে। মেধা ও পরিশ্রমের জোরে তারা এগিয়ে চললেও, উচ্চশিক্ষার পথে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চরম দারিদ্র্য ও আর্থিক অসচ্ছলতা।

সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার মধ্যনগর বিশ্বেশ্বরী পাবলিক উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী স্বপ্ন রায়ের জীবনসংগ্রাম অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তিন বছর আগে লিভার সিরোসিসে বাবা অভিজিৎ রায় এবং তারও দুই বছর আগে স্তন ক্যানসারে মা সন্ধ্যা রানী দাসকে হারায় সে। মা-বাবার চিকিৎসা বাবদ সহায়-সম্বল সব শেষ হয়ে যাওয়ায় অসহায় হয়ে পড়ে স্বপ্ন। কাকা অভিমুন্য রায় তাকে আশ্রয় দিয়ে নিজ সন্তানের মতো লালন-পালন করছেন। স্বপ্ন রায় ভবিষ্যতে ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করার স্বপ্ন দেখছে। তবে কাকার সীমিত সামর্থ্যে তার উচ্চশিক্ষার খরচ জোগানো অনিশ্চিত বলে শঙ্কা রয়েছে। বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ বিজন কুমার তালুকদার জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে স্বপ্ন রায় দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।

নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের বাঁশবাড়ি মহল্লার বস্তির একটি ছোট টিনের ঘরে বেড়ে ওঠা মোছা. শাবনাজ খাতুন রানিও সাফল্যের নজির গড়েছে। আল ফারুক একাডেমির এই শিক্ষার্থী বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। তার বাবা মো. ইসমাইল রিকশা চালিয়ে সংসার চালান এবং এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা কিনেছিলেন, যার কিস্তি পরিশোধেই অধিকাংশ আয় ব্যয় হয়ে যায়। অসুস্থ মায়ের পক্ষে আর কাজ করা সম্ভব নয়। প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলামের মতে, শাবনাজের একাগ্রতাই তাকে এই সাফল্য এনে দিয়েছে। তবে এখন উচ্চশিক্ষার ব্যয় বহন করা নিয়ে পরিবারের চোখেমুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার লিজা আক্তার প্রতিকূলতাকে হার মানিয়ে এসএসসি ভোকেশনালে জিপিএ-৫ পেয়েছে। চার বছর বয়সে মা আমেনা বেগমকে হারানো লিজার বাবা বিল্লাল হোসেন অন্যের জমিতে দিনমজুরি করেন। পরিবারের আর্থিক সংকট মেটাতে ঋণ করে বড় ভাইকে বিদেশ পাঠানো হলেও তিনি সেখানে কর্মসংস্থানের অভাবে ভুগছেন। নবম শ্রেণি থেকেই টিউশনি করে নিজের পড়ার খরচ জোগানো লিজা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, লিজা অত্যন্ত মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের, তবে আর্থিক সহযোগিতা ছাড়া তার স্বপ্ন পূরণ কঠিন।

ঝিনাইদহের মহেশপুরের ফতেপুর গ্রামের লক্ষ্মী রাণী পাল এবারের এসএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। মাটির হাঁড়িপাতিল তৈরির পেশায় নিয়োজিত বাবা পরিতোষ পালের সামান্য আয়ে পাঁচ শতক জমির ওপর টিনের ঘরে চলে তাদের অভাবী সংসার। অভাবের কারণে স্কুলের গাইড বই কিনতে না পেরে লক্ষ্মী অন্যের খাতা দেখে পড়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, লক্ষ্মী অত্যন্ত মেধাবী। বিচারক হওয়ার স্বপ্ন দেখা এই শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।

এবারের এসএসসিতে সাফল্য অর্জনকারী প্রতিটি শিক্ষার্থীর গল্পই অনুপ্রেরণার। তারা মা-বাবার কষ্টকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে এবং শিক্ষকদের সহায়তায় এগিয়েছে। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে তাদের সবার পরিবারের মধ্যেই এখন চরম দুশ্চিন্তা কাজ করছে। প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে এই অদম্য মেধাবীরা তাদের স্বপ্নের পথে আরও বহুদূর এগিয়ে যেতে পারবে বলে প্রত্যাশা শিক্ষাবিদদের। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কেউ মা–বাবাকে হারিয়ে স্বজনের আশ্রয়ে বড় হয়েছে। চাকরির আরও তথ্য: বাবা অভিজিৎ রায় একটি ওষুধের দোকানে মাসিক বেতনে কাজ করতেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সহায় সম্পদ বলতে যা কিছু ছিল তা মা–বাবার চিকিৎসা বাবদ সবকিছুই বিক্রি করে দিতে হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জীবনসংগ্রামে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়লেও মেধাবী শিক্ষার্থী স্বপ্ন রায় দমে যায়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাদের বাড়ি মধ্যনগর উপজেলার ইটাউড়ি গ্রামে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনিই তাকে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার সাহস জোগান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হওয়ার প্রেরণা দেন।

শেয়ার করুন