নাগরিক নিরাপত্তা ও অতীতের শিক্ষা: আমরা কি সব ভুলে যাচ্ছি?

প্রকাশ:

গৃহকোণ থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা কিংবা আবাসিক এলাকা—কোথাও সাধারণ মানুষ এখন আর পুরোপুরি নিরাপদ বোধ করছেন না। ভোরে রিকশা থেকে ব্যাগ টানতে গিয়ে নারীর মৃত্যু, দিনদুপুরে ব্যাংকের টাকা ছিনতাই, প্রকাশ্যে গুলির ঘটনা, সশস্ত্র মহড়া এবং পরিত্যক্ত অবস্থায় লাশ উদ্ধারের মতো একের পর এক ঘটনায় সারা দেশে নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তীব্র হচ্ছে। এই পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে ঘরে-বাইরে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে এবং তীব্র সমালোচনা চলছে। আওয়ামী লীগ আমলের সেই অস্থিতিশীল সময়ে বিশিষ্ট সাংবাদিক নির্মল সেন তৎকালীন সরকারের কাছে ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি’ চেয়েছিলেন। আজকের এই নিরাপত্তাহীনতার প্রেক্ষাপটে কেউ কি সেই একই দাবি তোলার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন?

নিরাপত্তাহীনতার এই সংকট কেবল মানুষের ঘরদুয়ারেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব শিল্প-বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে আছড়ে পড়ছে। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সুখ, শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিটি মানুষের চিরন্তন কামনা। সাধারণ মানুষের সুখের সংজ্ঞা খুব জটিল কিছু নয়—একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই, দুমুঠো অন্ন, আর পরিবার-পরিজন নিয়ে শান্তিতে পথচলা। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও মানুষের সেই মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি। পথেঘাটে হকাররা সর্বরোগের মহৌষধ বিক্রি করছে, আর মানুষ নিরুপায় হয়ে তা কিনছে। ওষুধ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়—এই কথিত ওষুধ কি আদৌ রোগ সারে, নাকি বাড়ায়?

বর্তমান সরকার বিপুল গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে এবং মানুষের প্রত্যাশাও অনেক। তবে আজকের এই সংকটের গোড়া খুঁজে বের করা জরুরি। স্বাধীনতার পরপরই দেশে রাহাজানি, মজুদদারি ও প্রশাসনের অদক্ষতার কারণে যে অরাজকতা তৈরি হয়েছিল, তা আজও ইতিহাসের পাতায় কালো অধ্যায় হয়ে আছে। শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন রেডক্রস প্রধান গাজী গোলাম মোস্তফাকে উদ্দেশ্য করে কম্বল চুরির ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। এছাড়া পাকিস্তানি নাগরিকদের ফেলে যাওয়া শিল্প-প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় নেতাদের হাতে তুলে দেওয়ায় সেগুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, যা থেকে ‘চোরতন্ত্র’ বা লুটপাটের সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে।

২০১৪-২০২৪ পর্যন্ত ঠিক একই শৈলী অনুসরণ করে লীগের নেতাকর্মীরা চোরতন্ত্রের বিকাশ ঘটিয়েছে দুদার্ন্ত বেগে। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের শেষার্ধ পর্যন্ত বিকশিত চোরতন্ত্রের সাথে গুমতন্ত্র, অর্থ লোপাট ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য যোগ হয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই তন্ত্রমন্ত্রের অপছায়া এখনো রয়ে গেছে। এখনকার নিরাপত্তাহীনতা কেবল আকস্মিক কোনো ঘটনা নাকি এর পেছনে কোনো কূটকৌশল রয়েছে, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ভাসছে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিয়ে পাপাচার ভুলে যাওয়ার প্রবণতা একটি জাতিকে কখনো নিজের পায়ে দাঁড়াতে দেয় না। নবীন সরকারের উচিত সব মন্ত্রণালয়ের কাজের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা এবং অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্রুত এই অরাজকতার অবসান ঘটানো।

শেয়ার করুন