বিগত দুটি সরকারের অব্যবস্থাপনার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে দীর্ঘদিন ধরে অস্বস্তি বিরাজ করছে। চাল, ডাল ও ভোজ্যতেলের চড়া দামের কারণে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়। এর ওপর নতুন করে যুক্ত হয়েছে নিত্যব্যবহার্য সব পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি। গত তিন বছরের ব্যবধানে সাবান, টুথপেস্ট, ডিটারজেন্ট, নারিকেল তেল ও সেভিং রেজারসহ দৈনন্দিন জীবনের অতিপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফা করার প্রবণতা, কৃত্রিম সংকট তৈরি ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ ক্রেতারা এখন সবদিক থেকে পিষ্ট হচ্ছেন।
এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের পক্ষে সংসারের আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। মাসের শুরুতে পাওয়া বেতন শেষ হতে না হতেই পকেট খালি হয়ে যাচ্ছে। জীবনযাত্রার খরচ সামলাতে বাধ্য হয়ে অনেকেই খাদ্যতালিকা থেকে মাছ-মাংস বা পছন্দের খাবার বাদ দিচ্ছেন। এমনকি নিত্যব্যবহার্য প্রসাধনী ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী কেনার ক্ষেত্রেও কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন ক্রেতারা।
রাজধানীর বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ঘুরে জানা গেছে, খুচরা বাজারে মাঝারি আকারের একটি লাইফবয় সাবানের দাম এখন ৬০ টাকা, যা তিন বছর আগে ৪০ টাকা এবং চার বছর আগে মাত্র ৩০ টাকা ছিল। বড় আকারের লাক্স সাবান কিনতে এখন গুনতে হচ্ছে ৯০ টাকা, যার আগের দাম ছিল ৬৫ টাকা। কাপর ধোয়ার ডিটারজেন্টের মধ্যে এক কেজি হুইল পাউডারের দাম ১০০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ১৭০ টাকা হয়েছে। একইভাবে আগে ১৪০ টাকায় বিক্রি হওয়া এক কেজি রিন পাউডারের বর্তমান দাম ২০০ টাকা। এছাড়া আগে যে পেপসোডেন্ট টুথপেস্ট ১০০ টাকায় পাওয়া যেত, তা এখন ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অন্যান্য পণ্যের মধ্যে মাঝারি আকারের প্যাকেটজাত চানাচুরের দাম ৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ৫০ টাকা এবং এনার্জি বিস্কুটের দাম ৩০ টাকা থেকে বেড়ে ৫০ টাকা হয়েছে। ওয়ানটাইম সেভিং রেজারের দাম ছিল ১৫ থেকে ২০ টাকা, যা এখন বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়। ২৫০ এমএল প্যারাসুট নারিকেল তেলের বোতল ১৪৫ টাকার পরিবর্তে এখন ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৪০০ টাকার অ্যারোসেলের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায় এবং ২৪০ টাকার এয়ারফ্রেশনার এখন বিক্রি হচ্ছে ৩২০ টাকায়।
রাজধানীর মালিবাগ এলাকার একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে বাজার করতে আসা মো. হানিফ হাওলাদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত কয়েক বছরে নিত্যব্যবহার্য সব পণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। সবাই চাল-ডাল বা খাদ্যপণ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও এসব প্রসাধন ও পরিচ্ছন্নতা সামগ্রীর দিকে কারও নজর নেই। কোম্পানিগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো দাম বাড়িয়ে চলেছে এবং বাজার তদারকির কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ফলে সবদিক থেকেই সাধারণ ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
এ প্রসঙ্গে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, কিছু যৌক্তিক কারণে দেশে পণ্যের দাম বাড়লেও ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফা লোটার সুযোগ খোঁজেন। বিভিন্ন অজুহাতে তারা কারসাজি করে পণ্যের দাম যৌক্তিক সীমার চেয়ে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেন। এতে ক্রেতারা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। তদারকি সংস্থাগুলোর উচিত আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখা এবং অনিয়ম পেলে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা। পাশাপাশি ভোক্তাদেরও এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।
এদিকে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, করোনা মহামারির পর আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম ও চাহিদা হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রথম দফায় এসব পণ্যের দাম বাড়ে। পরবর্তীতে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন খরচ বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে পণ্যের দামে। এছাড়া বিদ্যুতের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ডলার সংকটের কারণে আমদানি ব্যয় অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে দফায় দফায় দাম বাড়ার ফলেও স্থানীয় বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।





