দেশের ১০ ব্যাংকে পুঞ্জীভূত খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশ

প্রকাশ:

দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট খেলাপি ঋণের (এনপিএল) ৭২ শতাংশের বেশি এখন মাত্র ১০টি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত। বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন প্রান্তিকভিত্তিক সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায়। এটি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ, বর্তমানে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকাই খেলাপি। মার্চ শেষে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যার মানে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপির অঙ্ক বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।

জুন শেষে এই ১০টি দুর্বল ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। ব্যাংকিং খাতের এই সংকট সব ব্যাংকে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েনি; বরং অনিয়ম, দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, প্রভাবশালী গ্রাহকদের সুবিধা প্রদান এবং ঋণ আদায়ে ব্যর্থতার কারণে কয়েকটি ব্যাংকের পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বড় করপোরেট ঋণের একটি অংশ বছরের পর বছর আদায় না হওয়ায় এসব ব্যাংকের সম্পদের মান দ্রুত অবনতি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন করেও সংকট কাটানো যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট-২০২৫’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩০.৬০ শতাংশ, যা তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ছিল ২০.২০ শতাংশ। জুন শেষে এই হার আরও বেড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় ব্যাংকের মূলধন, প্রভিশন সংরক্ষণ ও মুনাফার ওপর চাপ বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাদের জুন মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ শেষে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩২.৬ শতাংশ, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকগুলোর গড় হার মাত্র ৭.৯ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে যে, ব্যাংকিং খাতের আর্থিক দুর্বলতা বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

১০টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের চিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ সর্বোচ্চ ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের ৫২.১৫ শতাংশ। জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৭৫ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৭৫.০৫ শতাংশ। একীভূত ব্যাংকগুলোর অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়; এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৯৭.০৮ শতাংশ, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৯৬.৭৮ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৭৮.১৫ শতাংশ ও এক্সিম ব্যাংকের ৭০.৮১ শতাংশ ঋণ এখন খেলাপি। এছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংকের ৬৫.৭৪ শতাংশ, এবি ব্যাংকের ৫৬.৪০ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের ৪৩.৯৮ শতাংশ ঋণ খেলাপি অবস্থায় রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালক জানান, শুধু পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন দিয়ে এ সংকট সমাধান সম্ভব নয়। তিনি বলেন, অনাদায়ী ঋণের প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ, দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ঋণ আদায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। নতুন ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে গ্রহীতার সক্ষমতা যাচাই ও তদারকি জোরদার না করলে কয়েকটি ব্যাংকের এ সংকট পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আরও বড় চাপ তৈরি করতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এরই মধ্যে খেলাপি ঋণ কমাতে তদারকি বাড়ানো, সম্পদের মান যাচাই এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর সংস্কার ও পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে।

শেয়ার করুন