৮ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাত মেলানোর অপেক্ষায় বাংলাদেশ-ভারত

প্রকাশ:

ভারতের দিল্লিতে কোথাও যেন অপেক্ষা করছে একটি করমর্দন। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার সম্পর্কে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনালগ্নে এই করমর্দন কেবল ছবি তোলার আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং দুই দেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা, ইতিহাস, বাণিজ্য এবং দীর্ঘ অভিন্ন সীমান্তে আবদ্ধ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা বহন করে। গত কয়েক বছরে দুই দেশের মধ্যে যে গভীর অবিশ্বাসের বলয় তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে একটি কার্যকর ও ফলপ্রসূ সম্পর্ক পুনর্গঠন করা সম্ভব কি না, এই সাক্ষাৎ তারই একটি বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। তবে এখনো এই সফরের সঙ্গে যুক্ত হয়নি কোনো চূড়ান্ত তারিখ বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। তবে সফরের সম্ভাব্য সময় হিসেবে নভেম্বর মাসের কথা বিবেচনা করা হলেও দুই পক্ষই মূলত আগে রাজনৈতিক পরিবেশের অনুকূলতা খুঁজছে। অর্থবহ ফলাফল নিশ্চিত করতে দুই পক্ষই সফরপূর্ব প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তাকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ কোনো দেশই অন্যপক্ষের প্রতিটি দাবি পুরোপুরি মেনে নেওয়ার আশা করতে পারে না; তবে সুনির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য ফল বয়ে আনে এমন একটি প্রক্রিয়া উভয়ের জন্যই লাভজনক হতে পারে। নয়াদিল্লি থেকে প্রকাশিত মাসিক ম্যাগাজিন ইন্ডিয়ান এম্পায়ারের এক সংখ্যায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। দুটি ঘটনাই ভারতের আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশের অংশ হলেও এগুলো আলাদা ঘটনা।

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে। এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঠিক চার মাস পর, প্রায় ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। তার এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। দেশে ফেরার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তার মা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেন। বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী এক নেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তবে বংশানুক্রমিক রাজনীতি, তার নিজস্ব রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এবং বিরোধী দলে থাকার সময়কার নানা অভিযোগের কারণে তাকে দীর্ঘ সময় নানামুখী সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তারেক রহমান বিভিন্ন সময়ে দেশের চলমান সংকট, জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা এবং গণতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জের ওপর জোর দিয়েছেন। যুক্তরাজ্যে থাকাকালীন সাধারণ জীবনযাপনের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় চাপমুক্ত পরিবেশ এবং জনসাধারণের ভিড় ছাড়াই চলাফেরার যে অভিজ্ঞতা তিনি পেয়েছেন, তার কথাও তিনি বিভিন্ন সময় তুলে ধরেছেন। জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে তিনি বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসে তার বাবা, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। নির্বাসিত জীবনে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনের কিংস্টনে থাকতেন তিনি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের ব্যস্ততা থেকে দূরে তার জীবনযাপন ছিল তুলনামূলক শান্ত। রিচমন্ড পার্কে হাঁটা এবং ইতিহাসের বই পড়া ছিল তার পছন্দের কাজগুলোর মধ্যে। তবে এখন তার জীবন নিরাপত্তা, দায়িত্ব ও জনপ্রত্যাশার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। নির্বাসিত জীবনে অর্জিত দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের শাসন পরিচালনায় কতটা কাজে লাগে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। ওই সময় জয়শঙ্কর আশা প্রকাশ করেন, খালেদা জিয়ার ‘দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ’ দুই প্রতিবেশীর অংশীদারত্বের বিকাশে পথ দেখাবে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রনীতি দিল্লির সঙ্গে আগের তুলনায় কম ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচিত হয়।

বিএনপির বিজয় ও ভারত-বাংলাদেশ নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান। এই নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের নতুন মেরুকরণ লক্ষ্য করা যায়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথ গ্রহণের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে তাকে বিশেষ অভিনন্দন জানানো হয়। এসময় নরেন্দ্র মোদি টেলিফোনে স্পষ্টভাবে জানান যে, একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পাশে ভারত সবসময় থাকবে। ভারতের এই বার্তা দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে ভারতের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল সাক্ষাৎ করেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত শোকবার্তা পৌঁছে দেন। এছাড়া কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে পররাষ্ট্রসচিবকে নয়াদিল্লিতে হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানোর মাধ্যমে ওই পদে গুরুত্ব বাড়ানো হয়েছে। গত ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত নিয়োগের অনুমোদনের খবর পাওয়া গেলেও আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান ছিল। তবে নভেম্বরে সম্ভাব্য সফরের বিষয়ে জানতে চাইলে হাইকমিশনার ত্রিবেদী সংযত কণ্ঠে জানান, ভারতের আমন্ত্রণ এখনো বহাল রয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে তাড়াহুড়োর কোনো অবকাশ নেই। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও নিশ্চিত করেছেন যে, সফর নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলমান রয়েছে। এই ধীরস্থির প্রক্রিয়ায় এটিই স্পষ্ট যে, সম্পর্কের নতুন ভিত্তি স্থাপনে দুই দেশই যথেষ্ট সতর্ক ও সজাগ অবস্থান বজায় রাখছে। এই করমর্দন ও বৈঠক কেবল দুই নেতার সাক্ষাৎ নয়, বরং দুই দেশের জনগণের প্রত্যাশা ও দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুত্বের এক নতুন ভিত্তি স্থাপনের প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এখন তারেক রহমানের আবির্ভাব সেই সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই সফর সম্পর্কের মোড় ঘোরানো ঘটনায় পরিণত হবে কি না, তা নির্ভর করবে আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে দুই সরকার কী নিয়ে আলোচনা, সমঝোতা ও বাস্তবায়ন করতে প্রস্তুত, তার ওপর। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চাপের মুখে, অর্থনীতি নানা সংকটে এবং জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তার জানাজায় ঢাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হয় এবং বিভিন্ন দেশের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা অংশ নেন। টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাকে স্বল্পভাষী ও চিন্তাশীল হিসেবে দেখা গেছে। তবে এখন তার দায়িত্ব কেবল ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত বোধ করা একটি দলকে নেতৃত্ব দেওয়া নয়; বরং বিভক্ত একটি দেশকে পরিচালনা করা। নিরাপত্তা, প্রকাশ্য বক্তব্য ও দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাশা নিয়েও মতপার্থক্য তৈরি হয়। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেন। নির্বাচনের পরও বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখে ভারত। এই বক্তব্য সহযোগিতার পথ খুলে দিয়েছে, তবে দুই দেশের কঠিন সমস্যাগুলো মিটে গেছে—এমন ইঙ্গিত দেয়নি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বাগত তারেক রহমানের বিজয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা অভিনন্দন জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বিএনপি ও তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, আঞ্চলিক সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা এগিয়ে নিতে নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী ওয়াশিংটন।

শেয়ার করুন