৩১ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাজ্য হোম অফিসের ৮৬ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রকাশ

প্রকাশ:

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা পর্যালোচনার ওপর ভিত্তি করে ৮৬ পৃষ্ঠার একটি গাইডলাইন প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (হোম অফিস)। ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন’ শিরোনামের এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে যুক্তরাজ্য হোম অফিসের ‘কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনফরমেশন টিম’ (CPIT)। তথ্য সংগ্রাহক দলটির তিন কর্মকর্তা ২০২৬ সালের ৭ থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করেন। ওই সফরে মূলত ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর নজর দেওয়া হয়। সফরকালে তাঁরা রাজনীতিবিদ, পুলিশ কর্মকর্তা, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, আইনি সহায়তা প্রদানকারী ও গবেষকসহ ২৪ জন প্রতিনিধির সঙ্গে মোট ১৫টি পৃথক সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৪ই অক্টোবর এই চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি জনসমক্ষে আনা হয়। ২০২৬ সালের ৭ থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত, ‘কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনফরমেশন টিম’ (CPIT)-এর ৩ জন কর্মকর্তা বাংলাদেশ সফর করেন। এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করা, বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থান এবং একই বছরের আগস্টের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে। বৃটিশ ওই তিন কর্মকর্তা ১৫টি সাক্ষাৎকারে মোট ২৪ জনের সঙ্গে কথা বলেন। রিপোর্টে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়েছে এবং সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে। এর কারণ হলো ক্ষমতায় থাকাকালীন দলটির দ্বারা সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা। প্রতিবেদনটির ভূমিকায়ও বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির সাক্ষাৎকার অন্তর্ভুক্ত হওয়া মানেই তার দেওয়া প্রতিটি তথ্যের প্রতি হোম অফিসের সমর্থন নয়; তথ্যগুলো অন্যান্য প্রকাশ্য উপাত্তের সঙ্গে মিলিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে।

প্রতিবেদনটিতে দেশের রাজনৈতিক ধারার একটি বহুমুখী চিত্র ফুটে উঠেছে। সফরকারী দলের মূল্যায়নে দেখা যায়, গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে এক ধরনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে এবং পরিস্থিতি সার্বিকভাবে উন্নত হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদের পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচনটি তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ ছিল এবং এতে অতীতের তুলনায় সহিংসতার ঘটনা অনেকটাই কম দেখা গেছে। বর্তমানে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (NCP) সহ অন্যান্য দল স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক তৎপরতা, জনসভা, মতামত প্রচার ও সরকারের সমালোচনা করার সুযোগ পাচ্ছে, যা বিগত আওয়ামী লীগ আমলের চেয়ে অনেক বেশি উন্মুক্ত। রাজনৈতিক সহিংসতা এখনও থাকলেও তা মূলত আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার, ব্যবসায়িক আধিপত্য বা সম্পদ দখলকে কেন্দ্র করে ঘটে থাকে। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নির্বাচনটি ছিল মোটামুটি শান্তিপূর্ণ এবং পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোর তুলনায় এতে সহিংসতার মাত্রা ছিল অনেক কম; এছাড়া নির্বাচনের পর থেকে রাজনৈতিক সহিংসতার হারও হ্রাস পেয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও তুলে ধরা হয়েছে যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা ভুয়া মামলার শিকার ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ মুক্তি পেয়েছেন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বিগত আমলের রাজনৈতিক ও ভিত্তিহীন প্রায় ২১ হাজারেরও বেশি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং অন্যান্য পুরোনো মামলাগুলোর পর্যালোচনার কাজ অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যক্রম এখনো নিষিদ্ধ রয়েছে। দলটির অতীত কর্মকাণ্ড ও ২০২৪ সালের জুলাই ঘটনার কারণে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ বিদ্যমান। আওয়ামী লীগের যেসব কর্মী বা সমর্থক সরাসরি কোনো সহিংসতা বা অপরাধে যুক্ত ছিলেন না, তারা নিজ নিজ এলাকায় থাকতে পারলেও প্রকাশ্যে দলীয় অবস্থান ব্যক্ত করলে সামাজিক বিদ্বেষ বা সহিংসতার মুখোমুখি হতে পারেন। এর ফলে অনেক নেতাকর্মী দল ত্যাগ করেছেন, এলাকা বদলেছেন বা বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন।

একই সঙ্গে, আওয়ামী লীগের বহু সাবেক নেতা ও কর্মী বর্তমানে একাধিক ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত রয়েছেন, যার বিচার সাধারণ আদালত এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)—উভয় স্থানেই চলমান। কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি জামিনে মুক্ত হলেও অনেকে এখনও কারাগারে বিচারপ্রক্রিয়ার অধীনে আছেন। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাজ্যে আসা ব্যক্তিদের আশ্রয়, অভিবাসন এবং মানবাধিকারসংক্রান্ত আবেদন মূল্যায়নে সহায়তা করার উদ্দেশ্যেই এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি সরাসরি কারো আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে না, বরং বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রের মতামতের একটি সংকলন মাত্র। সামগ্রিকভাবে, বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক অধিকার বৃদ্ধি ও মামলা প্রত্যাহারের মতো ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি পুলিশের জবাবদিহিতা, সার্বিক নিরাপত্তা ও সংস্কার প্রস্তাবগুলোর ধীরগতি নিয়ে প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে দুর্নীতি, পুলিশের জবাবদিহিতা ও কার্যকারিতা, এবং গণঅভ্যুত্থানের পর প্রস্তাবিত ব্যাপক সংস্কারগুলোর সীমিত বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো উদ্বেগ রয়ে গেছে। কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি জামিন পেয়ে মুক্তি পেলেও, অন্যরা এখনো বিচারের অপেক্ষায় কারাগারে আটক রয়েছেন।

শেয়ার করুন