নামের মিল থাকায় প্রকৃত আসামির পরিবর্তে ১০ মাস ধরে কারাগারে আছেন মো. আলমাছ নামের এক ব্যক্তি। অস্ত্র আইনের দীর্ঘ ২২ বছর আগের একটি মামলার রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রেপ্তার হওয়া এই ব্যক্তি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। এই ঘটনায় প্রকৃত আসামি ও রিট আবেদনকারী আলমাছের পরিচয় যাচাইয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। তাই রিট আবেদনকারীকে গ্রেপ্তার বেআইনি ও স্বেচ্ছাচারী।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ২০০২ সালের ১০ এপ্রিল মিরপুর থানায় দায়ের করা অস্ত্র আইনের একটি মামলায় মো. আলমাছ ও নাজমুল আলম মামুনকে আসামি করা হয়। ২০০৪ সালের ১৯ জুন ঢাকার ১১ নম্বর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল রায়ে আলমাছকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন এবং অপর আসামি নাজমুলকে খালাস দেন। রায়ের সময় আলমাছ পলাতক ছিলেন এবং তাঁর নামে সাজা পরোয়ানা জারি হয়। নথিপত্র অনুযায়ী, সাজাপ্রাপ্ত আসামির বাবার নাম খলিল আহমেদ এবং গ্রাম দক্ষিণ বাহ্রা, দোহার, ঢাকা। তাঁর বর্তমান ঠিকানা হিসেবে মিরপুরের পাইকপাড়ার উল্লেখ ছিল।
বর্তমানে কারাগারে থাকা আলমাছের দাবি, তিনি ওই মামলার প্রকৃত আসামি নন। রিট আবেদন অনুযায়ী, তাঁর বাবার নাম শেখ খলিল এবং গ্রাম সুন্দরীপাড়া, দোহার। রিটকারী আলমাছ জানান, তাঁর জন্ম ১৯৮৫ সালের ১০ ডিসেম্বর। মামলার ঘটনার সময় তাঁর বয়স ছিল ১৬ বছর ৪ মাস, অথচ এজাহারে আসামির বয়স উল্লেখ ছিল ২৪ বছর। এর আগেও ২০১৮ সালে নামের মিলের কারণে একবার আটক হয়ে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে জিম্মানামায় তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন। সে সময় কুসুমহাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রত্যয়নপত্রে জানিয়েছিলেন, সাজাপ্রাপ্ত আলমাছ প্রায় ২৫ বছর আগে বাড়িঘর বিক্রি করে চলে গেছেন এবং বর্তমান রিট আবেদনকারী মামলার আসামি নন। জিম্মানামার (প্রসেস নং-১৬/২০১৭) মাধ্যমে তখন তিনি মুক্তি পান। রিটের সঙ্গে ২০১৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ২ নম্বর কুসুমহাটি ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যানের একটি প্রত্যয়নপত্র যুক্ত করা হয়েছে। পুলিশ প্রতিবেদনের ভাষ্য, দোহারের বাহ্রায় বসবাসের সময় আলমাছের বিরুদ্ধে মামলাটি হয়। ২০০৫ বা ২০০৬ সালে নদীভাঙনে তাঁর বাড়িঘর বিলীন হয়ে যায়। পরে পরিবার নিয়ে তিনি একই থানার সুন্দরীপাড়া (কুসুমহাটি) গ্রামে বসতি স্থাপন করে আত্মগোপনে থাকেন। রিটের সঙ্গে গত বছরের ৯ ডিসেম্বর দোহারের ১ নম্বর নয়াবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যানের একটি প্রত্যয়নপত্রও দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ২০ মার্চের পরোয়ানার ভিত্তিতে পুলিশ গত বছরের ৫ নভেম্বর এই আলমাছকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। এরপর গত বছরের ২৩ নভেম্বর বিশেষ ট্রাইব্যুনালে জামিন আবেদন করলে তা খারিজ হয়ে যায়। নিরুপায় হয়ে নিজের মুক্তি, নিরপেক্ষ তদন্ত ও পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে গত ১৭ আগস্ট হাইকোর্টে রিট করেন তিনি। প্রয়োজন হলে তাঁকে পুলিশ প্রশাসনের কাছে হাজির করা হবে।
রিটের প্রাথমিক শুনানির পর গত ৬ সেপ্টেম্বর বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঞার হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এই আদেশ দেন। ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে একজন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ৪৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে দোহারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপারকে সহায়তা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রকৃত আসামির পরিবর্তে তাঁকে কেন আটক রাখা আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত হবে না এবং কেন তাকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে। বিষয়টি আগামী ৫ নভেম্বর পরবর্তী শুনানির জন্য কার্যতালিকায় থাকবে।
রিট আবেদনকারীর আইনজীবী মো. তানভীর আহমেদ জানান, আসামির নাম ও বাবার নামের আংশিক মিল থাকায় সম্পূর্ণ নির্দোষ একজন মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তিনি ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে আসামির পরিচয় নিশ্চিতে ডিজিটালাইজেশন পদ্ধতি প্রবর্তনের ওপর জোর দিয়েছেন। এই রিট শুনানিতে আইনজীবী আবদুল্লাহ আবু সাঈদ ও আতিকুর রহমান উপস্থিত ছিলেন এবং রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর মুহাম্মদ আজমী।





