বাংলাদেশে ইয়াবা আসক্তির মহামারি: ধ্বংসের মুখে অগণিত জীবন

প্রকাশ:

থাই ভাষায় ‘ইয়াবা’ শব্দের অর্থ হলো ‘পাগল করা ওষুধ’। বর্তমানে এই মাদক বাংলাদেশের অগণিত মানুষের জীবন ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকার বাসিন্দা এবং ইয়াবায় মারাত্মকভাবে আসক্ত এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে ‘মেটালফ্রিক’ নামে পরিচয় দিয়েছেন, জানান যে এই মাদক তাঁর মানসিক অবস্থাকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। তিনি বলেন, ইয়াবা সেবনের পর চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা এর প্রভাব থাকে, যার ফলে তিনি টানা তিন দিন জেগে থাকার পর চরম ক্লান্তিতে ১২ ঘণ্টার বেশি সময় ঘুমাতে বাধ্য হন। তাঁর মতে, এটি মানুষকে পশু বানিয়ে দেয় এবং একসময়কার স্বাভাবিক জীবনযাপনকেও অসম্ভব করে তোলে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, দেশের সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের প্রায় ৫ শতাংশ মাদকে আসক্ত। আর ‘নতুন সিন্থেটিক ও আধা সিনথেটিক মাদকের বিস্তার’ এই সমস্যাকে আরও তীব্র করছে। চলতি মাসে বাংলাদেশের সংসদে মাদকসংক্রান্ত কিছু অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে একটি বিল অনুমোদন করা হয়েছে। বাংলাদেশে ইয়াবাকে ‘ক-শ্রেণির’ নিষিদ্ধ মাদক হিসেবে গণ্য করা হয়।

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে ২০১৮ সালে কর্তৃপক্ষ মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু করেছিল। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের নিষ্ঠুর ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধের’ মতো সেই অভিযানে কয়েক মাসের মধ্যে ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়। এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, ২০১৮ সালে ৪৬৬ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিল। সংস্থাটি বলেছে, মাদকবিরোধী অভিযান হিসেবে যা চালানো হয়েছিল, তা দেশের সবচেয়ে দরিদ্র কিছু এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। সেখানে মানুষের মনে এই ভয় ঢুকে যায় যে মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকার সামান্য সন্দেহের বশেই তাদের প্রিয়জনরা হয়তো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে পারে। এ ছাড়া আরও কয়েক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার মো. আরিফুজ্জামান বলেন, যদি মাদকের ব্যবহার কমাতে হয়, তবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি করতে হবে। ঢাকার নিরাময় পুনর্বাসন কেন্দ্রেও কাজ করেন আরিফুজ্জামান। ওই কেন্দ্রের অভ্যর্থনা কক্ষের পেছনের দেয়ালে লেখা আছে, ‘যেখানে নিরাময় শুরু, সেখান থেকেই জীবন।’ চিকিৎসক আরিফুজ্জামান জানান, সারা দেশে মাত্র ৩৫০ জনের মতো মনোরোগ–বিশেষজ্ঞ আছেন। জাতীয় ইনস্টিটিউটে মনোরোগ–বিশেষজ্ঞরা হয়তো এক ঘণ্টায় ২০ জন রোগী দেখতে পারেন, কিন্তু এর কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, বাংলাদেশে মানসম্পন্ন মনোবিজ্ঞানীরও একই রকম অভাব রয়েছে। তিনি চান, সরকার যেন মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করে। ২০১৮-১৯ সালে পরিচালিত সর্বশেষ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে দেখা গেছে, যাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন, তাদের প্রায় ৯০ শতাংশ কোনো চিকিৎসা নেন না। আরিফুজ্জামান বলেন, সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে, তবে গত কয়েক বছরে এ বিষয়ে সচেতনতা অভূতপূর্ব মাত্রায় বেড়েছে।

আরিফুজ্জামান বলেন, ইয়াবায় আসক্তি এখন খুবই সাধারণ বিষয়। তবে অনেক ব্যবহারকারী অন্যান্য মাদকও গ্রহণ করেন, যার মধ্যে বুপ্রেনোরফিন ইনজেকশন, হেরোইন ও ওমোরফোন বড়ি থাকতে পারে। প্রায় প্রতিটি মাদকের ব্যবহারই বাড়ছে, তবে ইয়াবার ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। তিনি বলেন, কিছু ব্যবহারকারী মাদক নেওয়ার পরও কর্মক্ষম থাকেন, তবে অন্যদের মস্তিষ্কের দুর্বলতার কারণে তাঁরা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। বন্যা, অগ্নিকাণ্ড ও কোভিড-১৯ মহামারি সংকটের মতো বাহ্যিক ঘটনাগুলো এই পরিস্থিতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। আসক্ত কিছু ব্যক্তি মাদকের খরচ জোগানোর অন্য কোনো উপায় না পেয়ে নিজেরাই কারবারি হয়ে যান। আবার অনেকে বিষণ্নতা, উদ্বেগজনিত মানসিক ব্যাধি কিংবা মানসিক ভারসাম্যহীনতার মতো সমস্যায় ভুগছিলেন, যা থেকে মুক্তি পেতে তাঁরা মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের (ইউএনওডিসি) তথ্য অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে ইয়াবা সেবন তরুণদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠার আগে এশিয়ার কিছু অংশে এটা ট্রাকচালকদের মতো পেশাজীবীরা সেবন করতেন। ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ১২ লাখ ইয়াবা বড়ি জব্দ করা হয়েছিল। থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও লাওসের সীমান্ত যেখানে মিলেছে, তা ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ নামে পরিচিত এবং এটি সিন্থেটিক মাদক উৎপাদনের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে সক্রিয় এলাকাগুলোর একটি। ইউএনওডিসি বলছে, ২০২৪ সালে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রেকর্ড ২৩৬ টন মেথামফেটামিন জব্দ করা হয়েছে, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে আসা ইয়াবার প্রধান উৎপাদনকারী দেশ হলো মিয়ানমার।

মেটালফ্রিক বলেন, সবারই কষ্টের গল্পগুলো প্রায় একই রকম। বাংলাদেশে যাঁরা ইয়াবায় আসক্ত হন, তাঁরা সাধারণত শুরুটা করেন সিগারেট দিয়ে, তারপর গাঁজা এবং এরপর কফ সিরাপ সেবন করেন। প্রথমবার ইয়াবা সেবনের সময় তিনি ভেবেছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা বা মাস্তি করতে ভালো লাগবে, কিন্তু এটি তাঁর মনকে চরম উত্তেজিত করে তোলে। ইয়াবা আগে আরও ব্যয়বহুল ছিল, তবে এখন সস্তা ও দামি দুই ধরনের ইয়াবাই পাওয়া যায়। সস্তা ইয়াবা মুখ ও দাঁতের পুরোপুরি বারোটা বাজিয়ে দেয়। তিনি বলেন, এই বড়ির কারণে তিনি অনেক বন্ধুকে হারিয়েছেন। নিয়মিত সেবন করলে স্ট্রোক হতে পারে, অনেকে দাঁত হারায় বা তাদের খিঁচুনি শুরু হয়। গত কয়েক বছরে আফিম বা হেরোইন পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে এবং ইয়াবা অন্য সব মাদককে পুরোপুরি হটিয়ে দিয়েছে। মোহাম্মদপুর এলাকায় অল্প বয়সী ছেলেদের বড়ির ছোট প্যাকেট উঁচু করে ধরে থাকতে দেখা যায়, যা রিকশাচালকেরা হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিচ্ছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়, যার জেরে শেখ হাসিনার পতন ঘটে। পরে ২০২৬ সালের নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জয়লাভ করে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। মেটালফ্রিক জানান, সম্প্রতি মারা যাওয়া তাঁর বাবাকে আগে সবাই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশংসা করলেও সম্প্রতি বন্ধুরা তাঁকে ভুয়া বলে। মেটালফ্রিক একটি ব্যবসা চালাতেন, কিন্তু আগুন লেগে তাঁর প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি পুড়ে যায়। এখন তিনি বাইরের জগতের সঙ্গে যুক্ত থাকেন ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে। তিনি বলেন, ইয়াবা মানুষকে মিথ্যা আত্মবিশ্বাস দেয়। এতে অনেকে অদ্ভুত সব ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করতে শুরু করে। তাঁর মতে, বিত্তবান মানুষের হাতেই মাদকাসক্ত হওয়ার মতো যথেষ্ট সময় থাকে। তিনি বলেন, ইয়াবা সেবনকারীরা দুই বছরও টিকতে পারে না, কারণ তারা ঘুমায় না। এটি ধীরে ধীরে বিষপ্রয়োগ, এটি একটি নিখুঁত পরিকল্পনা।

শেয়ার করুন