ইতালীয় লেখক উমবের্তো একো (১৯৩২–২০১৬) তার তৃতীয় উপন্যাস ‘দ্য আইসল্যান্ড অফ দ্য ডে বিফর’-এ বাস্তবতার প্রকৃতি, মানুষের পরিচয় এবং ভাষা ও চিহ্নের সীমাবদ্ধতা নিয়ে এক দীর্ঘ দার্শনিক অনুসন্ধান চালিয়েছেন। একো এই উপন্যাসে দেখাতে চেয়েছেন যে, আমরা যাকে বাস্তবতা বলে মনে করি, তার অনেকটাই আসলে মানুষের তৈরি ধারণা। ভাষা, প্রতীক ও রূপক অনেক সময় আমাদের সত্যের কাছে পৌঁছানোর বদলে বিভ্রান্ত করে।
উপন্যাসটি ১৭ শতকের অভিজাত যুবক রবার্তো দে লা গ্রিভ-এর চিঠির আদলে রচিত। একটি জাহাজডুবির পর রবার্তো প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে পরিত্যক্ত জাহাজ ‘ড্যাফনি’-তে আটকা পড়ে। নিজের অবস্থান নির্ণয়ে অক্ষম রবার্তো কল্পনার জগতে আশ্রয় নেয় এবং দূরবর্তী প্রেমিকা লিলিয়ার উদ্দেশ্যে চিঠি লিখতে শুরু করে। তার স্মৃতির পাতায় ক্যাসালের অবরোধ থেকে শুরু করে সৎভাই ফেরান্তের সঙ্গে তার জটিল সম্পর্কের নানা ঘটনা উঠে আসে। রবার্তোর মনে হতে থাকে, তার জীবনের প্রতিটি বিপদ আসলে ফেরান্তের ষড়যন্ত্র।
কার্ডিনাল মাজাঁরিনের নির্দেশে একটি গুপ্ত মিশনে গিয়ে রবার্তো এই রহস্যময় জাহাজে পৌঁছায়। জাহাজে অসংখ্য ঘড়ি ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উদ্ভিদ থাকলেও মানুষ নেই। জার্মান যাজক ফাদার ক্যাসপার ওয়ান্ডারড্রসেলের সঙ্গে তার কথোপকথন তাকে ধর্মীয় ও দার্শনিক বিভ্রান্তির গভীরে ঠেলে দেয়। উপন্যাসের বর্ণনাকারী রবার্তোর যুক্তিকে বারবার ব্যঙ্গ করেন, যা গল্প তৈরির প্রক্রিয়াকেই এক মজার খেলায় রূপ দেয়।
একো এই উপন্যাসে ‘রবিনসর ক্রসো’, ‘দ্য ম্যান ইন দ্য আয়রন মাস্ক’ এবং ‘গার্লিভার ট্রাভেলস’-এর মতো পরিচিত উপন্যাসের আবহ ব্যবহার করে ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির এক বিশাল কোলাজ তৈরি করেছেন। রবার্তোর বিভ্রান্তি ও তার লিলিয়ার প্রতি ভালোবাসা এই উপন্যাসের মানবিক দিকটিকে ফুটিয়ে তোলে। একোর মতে, আমাদের চারপাশের সংস্কৃতি অসংখ্য চিহ্ন ও গল্পের সমন্বয়ে তৈরি, আর মানুষ সেই জালের মধ্যেই নিজের পরিচয় ও বাস্তবতা নির্মাণ করে।
সাহিত্যিক উমবের্তো একো সবসময় গল্প বলতে ভালোবাসতেন। তার ‘বাউদোলিনো’ উপন্যাসেও সত্য, মিথ্যা ও গল্প বলার শক্তি নিয়ে গভীর চিন্তার প্রতিফলন রয়েছে। জেসিকা জার্নিগানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে একো জানান, গবেষণামূলক বইয়ের মধ্যেও একটি বুদ্ধিবৃত্তিক গল্প থাকে। তিনি সেমিওটিকস বা চিহ্নতত্ত্বকে মানুষের মানবিক দিক বোঝার মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেন।
হলি গ্রেইলকে তিনি অন্তহীন আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। একো মনে করেন, অনুবাদকের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে সাহিত্যের মূল রস অপর ভাষায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। বাবেল টাওয়ার ধ্বংসের পর মানুষের ভাষা আলাদা হয়ে গেলেও, বউদোলিনোর মতো চরিত্রগুলো সব মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের সেই আদি আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে। পৃথিবীকে দেখার ভিন্ন ভিন্ন উপায় বা বৈচিত্র্যময় ভাষা থেকেই মূলত সমৃদ্ধ গল্পের জন্ম হয় বলে তিনি বিশ্বাস করতেন।





