যমুনা বিধৌত সিরাজগঞ্জ জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শতাধিক বছরের পুরনো একটি সেতু। স্থানীয়দের কাছে 'বড়পুল' নামে পরিচিত এই সেতুটির দাপ্তরিক নাম ইলিয়ট সেতু। শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া যমুনার সংযোগস্থল কাটাখালী খালের ওপর এটি নির্মিত। এক সময় এই খালের পানির তীব্র স্রোত পুরো শহরকে দুই ভাগে বিভক্ত করে রেখেছিল, যাকে স্থানীয়রা 'এপার-ওপার' বলে অভিহিত করতেন। দুই পাড়ের মানুষের যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করার লক্ষ্যেই ১৮৯২ সালে তৎকালীন সাব-ডিভিশনাল অফিসার বিটসনবিল এই সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।
সেতুটি বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয় এবং ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড থেকে ১৫০০ টাকা অনুদান সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও নির্মাণকাজে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার স্টুয়ার্ট হার্টল্যান্ডের নকশা ও তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই সেতুর মোট ব্যয় ছিল ৪৫ হাজার টাকা। আসামের তৎকালীন গভর্নর চার্লস ইলিয়ট ১৮৯২ সালের ৬ আগস্ট এই সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং তার নামানুসারেই এর নামকরণ করা হয়। ১৮০ ফুট লম্বা ও ১৬ ফুট চওড়া এই সেতুটির নির্মাণকাজ ১৮৯৫ সালে সম্পন্ন হয়।
ইলিয়ট সেতুর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর পিলারবিহীন কাঠামো। লোহা ও সিমেন্টের সমন্বয়ে আর্চ বা খিলান পদ্ধতিতে নির্মিত এই সেতুটি কাটাখালী খালের ওপর প্রায় ৩০ ফুট উঁচুতে স্থাপন করা হয়েছে। নির্মাণের সময় এর নিচে দিয়ে বড় নৌকা ও জাহাজ অনায়াসে চলাচল করতে পারত, যার ফলে এটি তৎকালীন যাতায়াত ব্যবস্থায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। বর্তমান সময়েও সেতুটি তার সৌন্দর্য ও দৃঢ়তা বজায় রেখেছে। সাবেক পৌর মেয়র সৈয়দ আব্দুর রউফ মুক্তার ভাষ্যমতে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত সেতুটির অবকাঠামোগত কোনো বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি।
বর্তমানে সেতুটি ছোট গাড়ি ও পথচারীদের চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। এর নান্দনিক গঠনশৈলী দেখতে আজও বিভিন্ন বয়সী মানুষ ভিড় করেন। আইনজীবী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সুকুমার চন্দ্র দাস এবং আবু মোহাম্মাদ জুলফিকার জানান, ছোটবেলা থেকে তারা এই সেতুটিকে একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছেন। সময়ের পরিক্রমায় অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটলেও এই ঐতিহাসিক সেতুটি আজও অপরিবর্তিত রয়েছে। সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য প্রতি বছরই পৌর কর্তৃপক্ষ সেতুটিতে রঙের কাজ করে থাকে।





