একসময় ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান নয়াদিল্লি ও ঢাকার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে ক্ষমতাচ্যুতির দুই বছর পর, তার এই উপস্থিতিই এখন দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, নয়াদিল্লি থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতা এবং ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনার ঘোষণা সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে পুরোনো কূটনৈতিক ক্ষত আবারও উসকে দিয়েছে। এমন এক সময়ে তিনি এই রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন, যখন ভারত বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।
অনলাইন আউটলুক ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, শেখ হাসিনার এই কর্মকাণ্ডের বিষয়ে ঢাকা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত একজন পলাতক আসামিকে ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে। অন্যদিকে, ভারত এই ঘটনার সঙ্গে নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, ওই অনুষ্ঠান আয়োজনে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং হাসিনা যে রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ করেছেন, তার সঙ্গেও ভারত একমত নয়।
২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটলে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের একটি ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে, যদিও হাসিনা এই অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। ডিসেম্বরে তার ফেরার ঘোষণার গুরুত্ব শুধু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আগামী কয়েক মাসে বাংলাদেশের রাজনীতিকে নতুন করে রূপ দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করছে।
হাসিনার এই ঘোষণা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সমীকরণকে ওলটপালট করে দিয়েছে। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর এবং অনেক নেতা আত্মগোপনে বা আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার পর দলটি যখন প্রান্তিক পর্যায়ে ছিল, তখন হাসিনার এই অবস্থান সমর্থকদের জন্য নতুন আশা এবং বিরোধীদের জন্য নতুন প্রতিপক্ষের জন্ম দিয়েছে। তার ফেরা বা না ফেরা বড় কথা নয়, বরং এই সময়সীমাটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। বিএনপি সরকারের সামনেও এটি একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ; তাকে গ্রেপ্তার করলে সরকারের আইনি অবস্থান শক্তিশালী হবে, আবার রাজনৈতিক পরিসর দিলে আওয়ামী লীগকে পুনরায় ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া হবে।
নয়াদিল্লির জন্য এখন ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একদিকে হাসিনার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, অন্যদিকে বিএনপি সরকারের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বাধ্যবাধকতা। তিস্তা চুক্তি, গঙ্গা পানি বণ্টন এবং চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ পরিস্থিতির ওপর ছায়া ফেলছে। হাসিনার রাজনৈতিক ঘোষণাগুলো বাংলাদেশে এই সন্দেহ আরও জোরালো করছে যে, ভারত এখনো আওয়ামী লীগের সঙ্গে কৌশলগতভাবে যুক্ত। ভারতের জন্য এখন বড় পরীক্ষা হলো, হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি যে তার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনকে সমর্থন নয়, তা ঢাকাকে বোঝানো। একই সঙ্গে, হাসিনার বিষয়টি যেন দুই দেশের সম্পর্কের প্রধান নির্ধারক ইস্যুতে পরিণত না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হচ্ছে নয়াদিল্লিকে।





