রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সাড়ে ৬ বছরে অন্তত ১৬ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এসব শিক্ষার্থীর অধিকাংশই আবাসিক হলের বাইরে বিভিন্ন মেস, ছাত্রাবাস ও ভাড়া বাসায় থাকতেন। একের পর এক শিক্ষার্থীর অকাল মৃত্যুতে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও জনসংযোগ দপ্তরের তথ্য এবং বিভিন্ন সময় প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আত্মহত্যার ঘটনাগুলোর একটি বড় অংশ ঘটেছে ক্যাম্পাসের বাইরে মেহেরচণ্ডী, মির্জাপুর, বিনোদপুর ও আমজাদের মোড় এলাকার মেস ও ছাত্রাবাসগুলোতে। হলের বাইরে অবস্থান করায় শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন আচরণ, মানসিক পরিবর্তন কিংবা সংকট অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা সহপাঠীদের নজরের বাইরে থেকে যায়, ফলে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান বলেন, মেসে বা হলে থাকার সঙ্গে আত্মহত্যার সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও, মেসে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক একা থাকায় এমন ঘটনা ঘটতে পারে। তার মতে, মানসিক সমস্যা, হতাশা, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারা এবং সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্কজনিত টানাপোড়েন আত্মহত্যার অন্যতম কারণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ, পারিবারিক প্রত্যাশা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা ও একাকিত্ব শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। রাবি মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রধান চিকিৎসক অধ্যাপক মুর্শিদা ফেরদৌস বিনতে হাবিব জানান, শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতার পেছনে সামাজিক, মানসিক ও আর্থিক কারণ জড়িত। তিনি বলেন, পরিবার, শিক্ষক ও বন্ধুদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং দীর্ঘ সময় বিষণ্ণতা অনুভব করলে দ্রুত মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ঘটনাপঞ্জি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৮ অক্টোবর ফলিত গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী ফিরোজ কবীরের লাশ আমজাদের মোড় এলাকার মেস থেকে উদ্ধার করা হয়। ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী দেবজ্যোতি বসাক পার্থ নিজ বাড়িতে মারা যান। ২০২১ সালের ৩০ জানুয়ারি আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মোবাসসিরা তাহসিন ইরার লাশ মির্জাপুরের ছাত্রী হোস্টেল থেকে এবং ২২ সেপ্টেম্বর গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ইমরুল কায়েস নিজ বাড়িতে মারা যান। ২০২২ সালে বাংলা বিভাগের ইশতিয়াক মাহমুদ পাঠান, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগের সোহাগ খন্দকার, ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের সাদিয়া তাবাসসুম, নাট্যকলা বিভাগের জান্নাতুল মাওয়া দিশা এবং অর্থনীতি বিভাগের ছন্দা রায় মৃত্যুবরণ করেন। ২০২৫ সালে ফিশারিজ বিভাগের সিফাতুল্লাহ, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সোনিয়া সুলতানা এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের লামিসা নওরীন পুষ্পিতার লাশ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি সমাজকর্ম বিভাগের জুবাইদা ইসলাম ইতি এবং সর্বশেষ ১০ জুন ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মাহফুজুর রহমানের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়।
শিক্ষার্থীরা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আরও কার্যকর ও সহজলভ্য করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি বিভাগ ও আবাসিক হলে সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং হলের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য সংকটকালীন সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মহত্যা প্রতিরোধে মানসিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের আগেভাগেই শনাক্ত করে পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনা এবং মেস ও ছাত্রাবাসগুলোর বিষয়ে প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৯: ১০আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৯: ১৮
২০২৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফিশারিজ বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সিফাতুল্লাহর লাশ ক্যাম্পাস-সংলগ্ন মেহেরচণ্ডী এলাকার একটি ছাত্রাবাস থেকে উদ্ধার করা হয়। ১২ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন মির্জাপুর এলাকার একটি আবাসিক ভবন থেকে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সোনিয়া সুলতানার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ সময় তার কক্ষ থেকে কয়েকটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়। ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নগরীর বিনোদপুরের লেবুবাগান এলাকায় মেস থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী লামিসা নওরীন পুষ্পিতার লাশ উদ্ধার করা হয়।





