গুলিবিদ্ধ রক্তিমের শেষ মুহূর্ত ও মায়ের অকৃত্রিম স্মৃতি

প্রকাশ:

দৌড়ানোর সময় হঠাৎ করেই পৌরসভার মুখখোলা নোংরা ড্রেনের কিনারে চিত হয়ে পড়ে গেল রক্তিম। কোমর বরাবর গুলি লাগায় তার শরীর অবশ হয়ে পড়েছে। চারপাশের মানুষের মুতের উৎকট ঝাঁঝাল গন্ধে ভরা সেই ড্রেনের পাশে শুয়ে আকাশের রঙের পরিবর্তন দেখছিল সে। তার বাঁ পাশে ছিল জগলু ও মহিম, ডান পাশে পলক ও আতাউর এবং পেছনে ছিল নঈম ও মিজান। এই সহযোদ্ধাদের সাহসিকতা এবং নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন তাকে বরাবরই মুগ্ধ করত।

রক্তিমের শৈশব ছিল জন্মদাত্রী মায়ের শূন্যতায় ঘেরা। জন্মের পরপরই তার মা মারা যান এবং বছর না ঘুরতেই বাবা পুনরায় বিয়ে করেন। রানু বেগম নামের সেই নতুন মা রক্তিমকে নিজের গর্ভের সন্তানের মতোই স্নেহ দিয়ে বড় করেছেন। ছোট ভাই অনির সঙ্গে রক্তিমের কোনো পার্থক্য তিনি কখনো করেননি—খাবার থেকে শুরু করে ঈদের পোশাক, সবকিছুতেই ছিল সমান ভাগ। পিনু নামের এক ব্যক্তি রক্তিমকে তার সৎ মায়ের পরিচয় জানিয়ে দেওয়ার পর অনি ক্ষুব্ধ হয়ে পিনুর সঙ্গে খেলার সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। রানু বেগমের অকৃত্রিম মমতায় রক্তিম কখনোই নিজেকে সৎ ভাই হিসেবে অনুভব করেনি, বরং মনে মনে নিজের জন্মদাত্রী মাকে খুঁজত।

গুলিবিদ্ধ অবস্থায় জ্ঞান ফেরার পর রক্তিমের মনে পড়ে গেল বিদেশ পাড়ি দেওয়া ভাই অনির কথা। সে জানে না তার অবস্থা। প্রচণ্ড তৃষ্ণায় কাতর রক্তিমের মনে ভেসে ওঠে সহপাঠী বীথির কথা। প্যারিস রোড, ইবলিস চত্বর, শহীদ মিনার, লাইব্রেরি, পশ্চিমপাড়া, পদ্মাপাড় কিংবা টি-বাঁধের স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভিড় করতে থাকে। এক সপ্তাহ আগে বাড়িতে যাওয়া বীথি ফিরে আসবে বলেছিল, কিন্তু সে কি আর কখনো আসবে? শরীরে প্রচণ্ড শূন্যতা অনুভব করছে রক্তিম। চোখের সামনে ঝাপসা কুয়াশা আর কালো পর্দা নেমে আসছে।

মায়ের কোনো ছবি না থাকায় রক্তিম যতবারই মায়ের কথা ভেবেছে, রানু বেগমের মুখটিই ভেসে উঠেছে। মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে সে যেন কারো কণ্ঠ শুনতে পায়, কেউ তাকে নাম ধরে ডাকছে। কানের কাছে চুড়ির টুংটাং শব্দ আর নতুন শাড়ির খসখস শব্দে সে চিৎকার করে জানতে চাইল কে সেখানে। শেষ মুহূর্তে কারো হাতের স্নিগ্ধ পরশ অনুভব করল সে, যা তার কাছে মা অথবা বীথির স্পর্শের মতোই মনে হলো।

শেয়ার করুন