কমলাপুর মেট্রোরেল: জানুয়ারিতে পরীক্ষামূলক, এপ্রিলে যাত্রী নিয়ে চলাচল

প্রকাশ:

রাজধানীর মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেলের সম্প্রসারিত অংশে আগামী জানুয়ারিতে পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু করার পরিকল্পনা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে এই যাত্রা হবে যাত্রীবিহীন। এর তিন মাস পর, অর্থাৎ আগামী এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে যাত্রী নিয়ে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল শুরু করবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব।

মেট্রোরেল কমলাপুর পর্যন্ত চালু হলে যাত্রীদের সময় ও অর্থ দুটোই বাঁচবে। বর্তমানে মিরপুরের কাজীপাড়ার বাসিন্দা মো. মহসিন হোসেনকে প্রতি সপ্তাহে গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া যেতে কাজীপাড়া স্টেশন থেকে মেট্রোরেলে মতিঝিল নেমে ৫০ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে কমলাপুর গিয়ে বাস বা ট্রেনে উঠতে হয়। একইভাবে বাড়ি থেকে ফিরে কমলাপুর নেমে তাকে রিকশায় মতিঝিল হয়ে বাসায় ফিরতে হয়। কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু হলে তার মতো অনেক যাত্রীর অপেক্ষার অবসান ঘটবে।

ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের উড়ালপথ নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং কমলাপুরে মেট্রোরেলের স্টেশনও নির্মিত হয়েছে। বর্তমানে স্টেশনে টাইলস-গ্রানাইট, রং করাসহ অন্যান্য কাজ চলছে। তবে রেললাইন এবং বিদ্যুতের কাজ (ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল) কেবল শুরু হয়েছে। গত জুন পর্যন্ত মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত অংশের কাজের অগ্রগতি ৭৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

মেট্রোরেল কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ২০২২ সালে এবং প্রাথমিকভাবে ২০২৫ সালের জুনে এই অংশ চালুর পরিকল্পনা ছিল। সম্প্রসারিত অংশে উড়ালপথ ও কমলাপুরে স্টেশন নির্মাণকাজের জন্য ২০২৩ সালে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়। থাইল্যান্ডভিত্তিক ইতাল-থাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানি ৫১১ কোটি টাকার চুক্তিতে মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের ভৌত কাজ করছে, যেখানে সহযোগী হিসেবে রয়েছে বাংলাদেশের ম্যাকডোনাল্ড স্টিল।

অন্যদিকে, ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দিতে দেরি হয়। বিগত সরকারের আমলে এই কাজের জন্য ৬৫১ কোটি টাকা দর প্রস্তাব করা হয়েছিল। পরে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যয় কমানোর জন্য চাপ দিলে দর-কষাকষি করে ১৮৬ কোটি টাকা কমানো হয়। গত বছর ভারতীয় প্রতিষ্ঠান লারসন অ্যান্ড ট্যুবরোকে ৪৬৫ কোটি টাকায় এই কাজের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়।

বাকি কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে রেললাইন, লিফট, এস্কেলেটর, মনিটর, ট্রেনের দরজার সঙ্গে মিলিয়ে বাইরের দরজা, সংকেতব্যবস্থা ও স্বয়ংক্রিয় ভাড়া আদায়ের যন্ত্রপাতি বসানো। এছাড়াও ট্রেন চালানোর ও স্টেশন ভবনের জন্য সাবস্টেশনসহ বিদ্যুৎ-ব্যবস্থা স্থাপন করা হচ্ছে। এসব কাজের জন্য নতুন রেল বা কোচের প্রয়োজন নেই, কারণ ২৪ সেট কোচ আগেই আমদানি করা হয়েছে।

ডিএমটিসিএল জানিয়েছে, মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের লাইন ও বিদ্যুতের খুঁটি এবং তার বসানোর কাজ ৪ জুলাই শুরু হয়েছে এবং আগস্টের মধ্যে তা শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সংকেতব্যবস্থা, ভাড়া আদায় ও স্টেশনে প্রবেশের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা স্থাপন এবং প্ল্যাটফর্মের স্বয়ংক্রিয় দরজা বসানোর কাজ শেষ করতে সময় লাগবে। এসব যন্ত্র জাপানের নিপ্পন সিগন্যাল কোম্পানি থেকে আসবে। যন্ত্রপাতির ফরমাশ দেওয়া হলেও বিভিন্ন দেশে একই ধরনের যন্ত্রের চাহিদা থাকায় বাংলাদেশের যন্ত্রপাতি এখনো এসে পৌঁছায়নি। তবে ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ জানুয়ারির আগেই যন্ত্রপাতি পেয়ে যাওয়ার আশা করছে।

পরীক্ষামূলক চলাচল সাধারণত দুই মাসেই শেষ করা সম্ভব হলেও, উত্তরা থেকে মতিঝিল অংশে দিনের বেলা যাত্রী নিয়ে মেট্রোরেল চলাচল করার কারণে পরীক্ষামূলক চলাচল রাত ১২টার পর উত্তরা থেকে পুরো কমলাপুর পর্যন্ত চালানো হবে। এ কারণে পরীক্ষামূলক চলাচল শেষ করতে বেশি সময় লাগবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব প্রথম আলোকে বলেন, মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের বাকি কাজ পুরোদমে চলছে এবং সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে জানুয়ারিতে পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু হবে।

দেশের প্রথম মেট্রোরেল, এমআরটি লাইন-৬, উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশ চালু হয় ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর। পরের বছর ৪ নভেম্বর চালু করা হয় আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশের। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত দূরত্ব ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার। কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারিত হলে মোট দূরত্ব হবে ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার, অর্থাৎ বর্ধিত অংশের দূরত্ব ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার। উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মোট স্টেশনসংখ্যা ১৭টি।

২০১২ সালে অনুমোদনের সময় মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় ছিল ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা, যা বর্তমানে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। জাপানের উন্নয়ন সহযোগী আন্তর্জাতিক সংস্থা জাইকার কাছ থেকে ১৯ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে এই প্রকল্পে। ডিএমটিসিএল সূত্রে আরও জানা গেছে, ভবিষ্যতে উত্তরা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত সাড়ে সাত কিলোমিটার মেট্রোরেল সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আছে, যেখানে আরও পাঁচটি নতুন স্টেশন নির্মাণ করা হবে। তবে এই বিষয়ে এখনো কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়নি। সরকার ঢাকায় ছয়টি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে, যার মোট দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার। এর মধ্যে কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর এবং সাভার থেকে গাবতলী, মিরপুর ও গুলশান হয়ে ভাটারা পর্যন্ত দুটি মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্প চলমান আছে। এছাড়াও গাবতলী থেকে মোহাম্মদপুর, কারওয়ানবাজার হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত আরেকটি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

শেয়ার করুন