ইসরাইলকে রক্ষা ও মার্কিন আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে মক্কা চুক্তি

প্রকাশ:

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্বার্থে দায়িত্ব পালনের জন্য একটি ‘আরব’ বা ‘মুসলিম ন্যাটো’ গঠন করা। যদিও কিছু বিশ্লেষক একে তেলআবিবের বিরুদ্ধে জোট হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকের মতে সৌদি আরব ও তার প্রতিবেশীদের সুরক্ষা দিতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার পর এটি নতুন নিরাপত্তা নিশ্চয়তাদাতা খোঁজার ইঙ্গিত। অন্যদিকে সৌদিও বছরের পর বছর ধরে তেল আবিবের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চালিয়ে আসছে। এমনকি ১৯৮১ সাল থেকেই সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলকে এই অঞ্চলের সঙ্গে একীভূত করার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে।

বাস্তবিক অর্থে, মক্কা চুক্তি শীতল যুদ্ধের শুরুর দিককার মার্কিন নীতিরই আধুনিক সংস্করণ। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো পশ্চিমাপন্থী শাসনব্যবস্থা এবং তাদের নীরব মিত্র ইসরাইলকে সুরক্ষিত রাখা। এই ব্যবস্থার লক্ষ্য মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শত্রুরাই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তিকে তাৎক্ষণিকভাবে স্বাগত জানিয়ে একে ‘বড়, সাহসী এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেছেন। নতুন এই চুক্তিটি ১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত ‘বাগদাদ প্যাক্ট’ বা সেন্ট্রাল ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (সেন্টো) আদলে তৈরি।

এই চুক্তির মাত্র কয়েক দিন আগে, গত ৩০ জুলাই সৌদি আরব আরও ১৩টি দেশ নিয়ে একটি নতুন সামরিক জোট গঠন করে। বাহরাইন, বাংলাদেশ, কোমোরোস, জিবুতি, মিসর, জর্ডান, কুয়েত, পাকিস্তান, কাতার, সোমালিয়া, সুদান, তুরস্ক এবং ইয়েমেনের এডেনভিত্তিক সরকারকে নিয়ে গঠিত এই ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ (এমএমডিএ)-এর মূল লক্ষ্য লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের নৌপথ নিরাপদ রাখা। এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘অপারেশন প্রসপারিটি গার্ডিয়ান’-এরই উত্তরসূরি, যা হুতি আন্দোলনের হুমকির প্রেক্ষিতে গঠন করা হয়েছে।

তবে মক্কা চুক্তিতে মিসর ও জর্ডানের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইসরাইলি আগ্রাসনের শিকার হলে সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় তারা এতে যোগ দেয়নি। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের স্টিভেন এ কুকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সৌদি আরবের উদ্বেগই এই নতুন ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে। তবে তুরস্ক ও পাকিস্তান ন্যাটোর সদস্য বা দীর্ঘদিনের মার্কিন মিত্র হওয়ায় এই জোটের স্বাধীন কার্যক্রম নিয়ে সংশয় রয়েছে।

মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক খালিদ আল-জাবেরের মতে, এটি তৃতীয় শক্তিকেন্দ্র গঠনের প্রাথমিক প্রচেষ্টা, যাতে কোনো একক পক্ষ অঞ্চলটির ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে। গত নভেম্বরে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ওয়াশিংটনে কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেন এবং সৌদি আরবকে ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ মর্যাদা দেয়া হয় এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান দেয়ার প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়। সব মিলিয়ে মক্কা চুক্তি ও এমএমডিএ-এর মতো উদ্যোগগুলো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য ও ইসরাইলের স্বার্থ সুরক্ষারই ধারাবাহিকতা বলে মনে করা হচ্ছে।

শেয়ার করুন