মুগ্ধ হত্যা মামলা: কনস্টেবলের দায় নিয়ে ট্রাইব্যুনালে আইনি বিতর্ক

প্রকাশ:

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর উত্তরায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ ১১ জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এক নতুন আইনি বিতর্কের জন্ম হয়েছে। এর আগে গত ২১ জুলাই প্রসিকিউশনের পক্ষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ফরমাল চার্জ উপস্থাপন করা হয়। মামলার শুনানিকালে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা প্রশ্ন তোলেন, একজন মাঠপর্যায়ের কনস্টেবল কিভাবে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত বা ‘স্টেট পলিসি’ সম্পর্কে অবগত থাকতে পারেন। এ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনালের এজলাস কক্ষে বেশ তর্কাতর্কির আবহ তৈরি হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বেঞ্চে এই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। বেঞ্চের অপর সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ। দীর্ঘ শুনানির পর ২৬ আসামির বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশের জন্য আগামী ২০ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

শুনানিতে আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী অ্যাডভোকেট শামীম হায়দার পাটোয়ারী অভিযোগ থেকে মক্কেলদের অব্যাহতির আবেদন জানান। তিনি যুক্তি দেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ‘স্টেট পলিসি’ বা ‘অর্গানাইজেশনাল পলিসি’র সম্পৃক্ততা থাকা জরুরি। তিনি প্রশ্ন করেন, এডিসি বা এএসপি থেকে শুরু করে সাধারণ কনস্টেবল পর্যন্ত সবাই এই পলিসি সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন কি না। এছাড়া কমান্ড রেসপনসিবিলিটির ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশে দায়িত্ব পালনকারী অধস্তন সদস্যদের ওপর সরাসরি মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় চাপানো যায় না। এর জবাবে ট্রাইব্যুনাল জানায়, তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণে অপরাধ প্রমাণিত না হলে আসামিরা খালাস পাবেন, তাই উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

এদিন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের সাবেক এডিসি মির্জা সালাহউদ্দিন, উত্তরা পূর্ব থানার সাবেক ওসি মো: মজিবুর রহমান ও আজমপুর পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক কনস্টেবল মো: হোসেন আলীসহ আটজন গ্রেফতারকৃত আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। এছাড়া মামলার আরও ১৮ জন আসামি পলাতক রয়েছেন, যাদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ হাবিব হাসান ও সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান অন্যতম।

প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম জানান, আন্দোলন দমনে নির্বিচারে গুলি চালানো হয় এবং উবারচালক মোখলেছুর রহমান দুর্জয়কে সাঁজোয়া যান দিয়ে পিষ্ট করে তুরাগ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় অভিযোগ (১৯ জুলাই) অনুযায়ী, প্রথম দিনের ধারাবাহিকতায় পরদিনও একই এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর পুনর্নিবিচারে গুলি চালানো হয়। এতে রিদোয়ান শরীফ রিয়াদ জয়সহ চারজন ঘটনাস্থলেই নিহত হন এবং রাইসুল রহমান রাতুলসহ বেশ কয়েকজন মারাত্মকভাবে জখম হন। এই ঘটনাগুলো সুপরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্তর্ভুক্ত।

অন্যদিকে, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ১৭ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ঢাকা-৫ আসনের সাবেক এমপি কাজী মনিরুল ইসলাম মনুসহ আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে আরো দুই মাস সময় দেয়া হয়েছে। আগামী ৪ অক্টোবর এ প্রতিবেদন জমার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-২। এদিন সকালে সাবেক এমপি মনুসহ চারজনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। অন্য আসামিরা হলেন যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর শফিকুল ইসলাম খান ও যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ মুন্না। প্রসিকিউশন জানায়, ২০২৪ সালের ১৯ ও ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীতে ১৭ জনকে হত্যা করা হয়। গত ২২ জুলাই এই চারজনের বিরুদ্ধে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারি করেন ট্রাইব্যুনাল-২। এরই ধারাবাহিকতায় তাদের গতকাল এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।

শেয়ার করুন